হাত দিয়ে মুখ চেপে কাজ করতে হয় শিলিগুড়ির সাফাইকর্মীদের

267

শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি : শিলিগুড়ি পুরনিগমে স্থায়ী, অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ২০০০ সাফাইকর্মী রয়েছেন। এঁদের মধ্যে ৪০০ জনেরও বেশি লেপটোস্পাইরোসিসে আক্রান্ত বলে চিকিৎসকদের আশঙ্কা। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নিরাপত্তার অভাবে অনেক সাফাইকর্মীর মধ্যে এই রোগের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে বলে শহরের বিশিষ্ট ডাঃ শঙ্খ সেন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা করাতে আসা অনেক সাফাইকর্মীর মধ্যেই লেপটোস্পাইরোসিসের (প্রথমে জ্বর আসে। ঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে কিডনি নষ্ট, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে) উপসর্গ লক্ষ করেছি। যেটা বিনা নিরাপত্তায় শুধুমাত্র ড্রেন, নোংরা জায়গায় কাজ করার কারণেই হয়।

এই শহরে এলাকা পরিষ্কার করে পরিবেশ সুস্থ রাখতে যাঁরা ভোর থেকে কাজে নেমে পড়েন, তাঁরাই স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। গ্লাভস, গামবুট  অনেক দূরের ব্যাপার, মুখের মাস্ক ছাড়াই সাফাইকর্মীরা ড্রেন পরিষ্কার থেকে শুরু করে রাস্তা সাফাইয়ে কাজ করে চলেছেন। সাফাইকর্মীদের অভিযোগ, পুরনিগম থেকে সাবান দেওয়া অনেকদিন আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। গ্লাভস, মাস্ক পাওয়াটাও একেবারেই অনিয়মিত। এমন পরিস্থিতিতে সাফাইকর্মীদের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশই প্রায়ই অসুস্থ থাকছেন বলে পুরনিগমের কর্মচারী সংগঠনগুলির বক্তব্য। পুরনিগমের ডেপুটি মেয়র রামভজন মাহাতো বলেন, এটা ঠিকই যে, সাফাইকর্মীরা গ্লাভস, বুট পরছেন না। যেটা অবশ্যই পরা উচিত। তবে আমরা কিন্তু প্রত্যেককেই এগুলি দিই। এক্ষেত্রে সাফাইকর্মীদের সচেতনতার অভাব রয়েছে। আমরা এ বিষয়ে প্রত্যেক সাফাইকর্মীকে সচেতন করছি।

- Advertisement -

পুরনিগমে যে সাফাইকর্মীরা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে কিছু সংখ্যক পূর্ত বিভাগে কাজ করলেও বেশিরভাগটাই রয়েছেন জঞ্জাল অপসারণ বিভাগের আওতায়। সাফাইয়ে কাজের কারণে এই কর্মীরা যাতে অসুস্থ কিংবা কোনও সংক্রমণে আক্রান্ত না হন তার জন্য তাঁদের সুরক্ষার বিষয়টি দেখার দায়িত্ব পুরনিগমের। সেক্ষেত্রে হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্ক ও পায়ে গামবুট দেওযার নিয়ম রয়েছে। শহরের আনাচেকানাচে ঘুরলে কিন্তু সাফাইকর্মীদের এ ধরনের কোনও প্রতিরোধক ব্যবহার করতে দেখা যাবে না। বিবেকানন্দ রোডে কোদাল হাতে নর্দমা সাফাইয়ে ব্যস্ত এক সাফাইকর্মী বললেন, কিছু তো পাই না। হাত দিয়ে মুখ চেপেই কাজ করতে হয়। সাফাইকর্মীদের এভাবে কাজ করাটা সামাজিক লজ্জা বলে মনে করেন ডাঃ শঙ্খ সেন। তিনি বলেন, যাঁরা নিজেদের স্বাস্থ্য বিসর্জন দিয়ে সাফাইয়ের মাধ্যমে আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষা করছেন তাঁদের যে-কোনও কারণে হোক না কেন গ্লাভস, মাস্ক ও গামবুট পরে না থাকাটা দুর্ভাগ্যজনক। এভাবে কাজ করায় ওঁদের মধ্যে জলবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকছে। এমনকি হাঁপানির মতন সমস্যা হচ্ছে। গ্লাভস না পরে কাজ করার কারণে অনেক সময়ে হাত, পা কেটে গেলে সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকছে।

এই পরিস্থিতিতে পুরনিগমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিলিগুড়ি পৌর কর্মচারী কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক সৌমেন দাস রায়। তিনি বলেন, সাফাইকর্মীদের জন্য একসময় সাবানের ব্যবস্থা থাকলেও বহুদিন ধরে সেই সাবান দেওযা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মাঝেমধ্যে হঠাৎ করে কোনওদিন  গ্লাভস দেওয়া হলেও সেটি প্লাস্টিকের হওয়ায় একদিনেই ছিঁড়ে যায়। এককথায়, কোনও গ্লাভস, গামবুট না পরেই কাজ করার জেরে নানা ধরনের সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন সাফাইকর্মীরা। মোট সাফাইকর্মীর ২০ থেকে ৩০ শতাংশই প্রায়ই অসুস্থতায় ভুগছেন। একই অভিযোগ তুলছেন আইএনটিটিইউসি প্রভাবিত শিলিগুড়ি পৌর কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বময় ঘোষ। তিনি বলেন, সাফাইকর্মীদের মেডিকেল চেকআপটাও কিন্তু এখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পুরনিগম কিন্তু ওঁদের প্রতি কোনও নজরই দিচ্ছে না। সিটু প্রভাবিত শিলিগুড়ি পৌর কর্পোরেশন এমপ্লয়িজ অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সম্পাদক জীবন নাথ বলেন, এটা ঠিকই যে, সব সাফাইকর্মী এই গ্লাভস, বুট পাচ্ছেন না। যেটা সত্যিই পাওয়া উচিত। আবার কেউ পেলেও তাঁদের একটা বড় অংশই সচেতনতার অভাবে সেগুলি ব্যবহার করছেন না। ফলে দুই দিকেই কিন্তু সমস্যা রয়েছে।