শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার :  প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার কেজি দই তৈরি হয় কোচবিহার জেলার বাণেশ্বরে। ফোলানো-ফাঁপানো নয়, এটাই ঠিক তথ্য। এত পরিমাণ দই তৈরি হয় অথচ তা পড়ে থাকে না। বরং চাহিদার তুলনায় জোগান কমই। এখানকার দই খেয়ে মজেছেন বহু মানুষ। তাঁদের মধ্যে আছেন কোচবিহারের জেলাশাসকও। বাণেশ্বরের দই কোচবিহার জেলার গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে অন্য জেলা, অন্য রাজ্যেও। কিন্তু ভালো নেই সেখানকার দই ব্যবসায়ীরা। সরকারি সহায়তা পেলে বাণেশ্বরের দইয়ের হাত ধরে কোচবিহারের অর্থনীতির বড়ো পরিবর্তন হতে পারত বলে মনে করেন অনেকেই। সরকার উদ্যোগ নিলে দইকে কেন্দ্র করে এখানে একটা হাব, শিল্পও গড়ে উঠতে পারে। এছাড়া এখানকার দইয়ে জিআই ট্যাগের ব্যাপারেও চিন্তাভাবনা চলছে।

১৯৯৩ সালে মালদা থেকে দই তৈরির প্রক্রিয়া শিখে এসেছিলেন বাণেশ্বরের বাসিন্দা দুলাল পাল। দই তৈরির সেই পদ্ধতি নিজের মতো করে কিছুটা পরিবর্তন করেন তিনি। এরপর নিজেই শুরু করেন ব্যবসা। দুলাল পাল ও তাঁর ভাই ভানু পাল বলেন, প্রতিদিন আমরা ১০০০ লিটার দুধ কিনি। নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা থেকে দই তৈরি হয়। গাড়িতে করে সেগুলি পাঠানো হয় বিভিন্ন জায়গায়। অপর এক ব্যবসায়ী রাজু পাল বলেন, শুধুমাত্র দই তৈরির কাজেই শতাধিক পরিবার যুক্ত রয়েছে। ফলে এখানে একটি ভালো শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির একটি মেশিন কেনার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। তা দিয়ে আরও উন্নতমানের দই তৈরি করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, দইকে কেন্দ্র করে সরকারি উদ্যোগ তেমনভাবে চোখে পড়েনি। দই ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি কোনো সহযোগিতা পেলে ভালো হয়।

প্রতিদিন প্রায় আট হাজার কেজি দই তৈরি হয় বাণেশ্বরে। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, ডুয়ার্সের বিভিন্ন এলাকা বাদেও কোকরাঝাড়, গুয়াহাটি সহ নিম্ন অসমজুড়ে বিক্রি হয় সেই দই। সরকারি উদ্যোগ নিয়ে এই শিল্পের প্রসার ঘটানো হোক, এমনটাই চাইছেন বাসিন্দারা। স্থানীয় বিধায়ক অবশ্য উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কোচবিহার উত্তর কেন্দ্রের বিধায়ক নগেন্দ্রনাথ রায় বলেন, বাণেশ্বরে যাঁরা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন আমি তাঁদের সঙ্গে কথা বলব। প্রয়োজনে দইকে কেন্দ্র করে শিল্প গড়ার বিষয়টি বিধানসভায় তুলব। জেলাশাসক কৌশিক সাহা বলেন, বাণেশ্বরের দই আমি নিজেও খেয়েছি। খুবই সুস্বাদু দই। ব্যবসায়ীদের জন্য একটি হাব তৈরি করে দেওয়া যায় কিনা তা আমাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে রয়েছে। বাণেশ্বরে দই তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় দুধ সরবরাহ করা হয় পুণ্ডিবাড়ি থেকে। সেখানকার গোয়ালাদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে ১৫০ থেকে ২০০ পাইকার প্রতিদিনই হাজার হাজার লিটার দুধ নিয়ে আসেন বাণেশ্বরে। সেখানকার দই ব্যবসায়ীরা সেই দুধ দিয়ে তৈরি করেন ক্ষীর দই ও মিষ্টি দই। খোলাবাজারে সেই ক্ষীর দই ২০০ টাকা ও মিষ্টি দই ১৪০ টাকা প্রতি কেজিতে বিক্রি হয়ে থাকে। বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে তো বটেই সেইসঙ্গে বেশ কিছু মানুষও সেই দই ফেরি করে বিক্রি করেন। দই ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ব্যবসায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর্থিক সমস্যার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। তাই চাহিদার তুলনায় জোগানও রয়েছে কম। তাঁদের দাবি, সরকারি উদ্যোগে যদি একটি হাব তৈরি করা হয় তাহলে দইয়ের ব্যবসার প্রসার ঘটবে অনেকটাই। বিষয়গুলি নিয়ে তাঁরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হবেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। প্রশাসনের তরফেও বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জেলাশাসক জানিয়েছেন।

বাণেশ্বরের দই জিআই ট্যাগ পেতে পারে কিনা সেই বিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। জিআই ট্যাগ মিললে গোটা বিশ্বে বাণেশ্বরের দই চর্চিত হবে। ফলে সরকারি নানা সুবিধা তাঁরা পেতে পারেন। জেলাশাসক কৌশিক সাহা অবশ্য বলেছেন, জিআই ট্যাগ কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। যদি আগে কেউ জিআই ট্যাগ না পেয়ে থাকে তাহলে প্রশাসনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে বাণেশ্বরও হয়তো সেই তকমা পেতে পারে।