স্বীকৃতি পেতে রসকদম্বের পেটেন্ট চাইছেন মালদার কারিগররা

75

কল্লোল মজুমদার, মালদা : মিষ্টি খেতে কে না ভালোবাসে, কিন্তু এমন কিছু মিষ্টি রয়েছে যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। আর সেই মিষ্টি যদি হয় মালদার রসকদম্ব, তবে তো কথাই নেই। কারণ এই মিষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রীচৈতন্যদেবের নাম। যদিও এই মিষ্টি আজ-কালের যুগে হারাতে বসেছে তার স্বাদ। মালদার এই রসকদম্ব নিয়ে উৎসবের দাবি তুলেছেন বিশিষ্টজনেরা। রসগোল্লার মতো রসকদম্বর পেটেন্ট পেতে আন্দোলন গড়ে তোলার দাবি সামনে এসেছে।

মালদা জেলার বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক তথা গৌড় কলেজের অধ্যাপিকা সুস্মিতা সোম তাঁর গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, গৌড় সংলগ্ন রামকেলিতে চৈতন্যদেব একটি কদম ফুলের গাছের নীচে তিনদিন অতিবাহিত করেছিলেন। কদম্ব ফুলে ভরেছিল গাছটি। সেই কদম্ব ফুলের অনুকরণে তৈরি মিষ্টি দিয়ে চৈতন্যদেবকে আপ্যায়ন করা হয়। তা থেকেই সেই মিষ্টির নাম হয় রসকদম্ব। গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, রসকদম্ব আসলে ছোট রসগোল্লার ওপর খাঁটি ক্ষীরের প্রলেপ দেওয়া এক ধরনের মিষ্টি। ক্ষীরের ওপর থাকে মিষ্টি পোস্তর আরেকটি প্রলেপ। দেখতে একেবারেই কদম্ব ফুলের মতো। এই মিষ্টি কেবল মালদায় পাওয়া যায়।

- Advertisement -

রসকদম্ব নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সুস্মিতা সোম বলেন, এই মিষ্টি মালদার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আগের মতো আর স্বাদ নেই। এখন পোস্তর বদলে চিনির তৈরি ছোট ছোট দানা দেওয়া হয়। ক্ষীর আর আগের মতো স্বাদযুক্ত নয়। এককথায় বলা যায় মালদার রসকদম্ব ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। রসকদম্বের ঐতিহ্য ফিরিয়ে নিয়ে আসতে উত্সব করা যেতে পারে। এছাড়াও এই মিষ্টি পেটেন্ট পেতে আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত।

রসগোল্লা বাংলার না ওডিশার-তা নিয়ে বিতর্কে বাঙালিপক্ষের সংগঠন সপ্তডিঙা ফাউন্ডেশনের হয়ে কাজ করেছিলেন কলকাতার সেন্ট্রাল কলেজের অধ্যাপক বিষ্ণু সিকদার। সেই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন,  রসগোল্লার ক্ষেত্রে যে বিতর্কটি ছিল, রসকদম্বের ক্ষেত্রে তা নেই। তা নিশ্চিতভাবেই মালদা তথা গোটা বাংলার সম্পদ, অন্য কোনও রাজ্য এই মিষ্টির সত্ত্ব দাবি করতেই পারে না। তাই কোনও সংস্থা সামান্য উদ্যোগ নিলেই এর জিআই রেজিস্ট্রেশন করা সম্ভব। চৈতন্যদেবের রামকেলি আগমনের সঙ্গে প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যশালী মিষ্টান্ন জড়িয়ে আছে…। মালদায় এর আদিরূপ দেখা গেলেও শিলিগুড়ি, হাওড়া, হুগলি, দুই চব্বিশ পরগনা সহ দক্ষিণবঙ্গে এই মিষ্টি আজও সমান জনপ্রিয়।

মালদা শহরের সুকান্ত মোড়ের এক মিষ্টি ব্যবসায়ী নয়ন ঘোষের কথায়, রসকদম্ব মালদার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। বাবা যখন  ব্যবসা করতেন তখন থেকেই আমাদের দোকানে রসকদম্ব তৈরি হয়। দুইরকম রসকদম্ব পাওয়া যায়, একটা পোস্ত দিয়ে তৈরি, আরেকটা চিনির তৈরি বিশেষ দানা দিয়ে দাম ৭ টাকা থেকে ১০ টাকা।

ফাস্টফুডে অভ্যস্ত নতুন প্রজন্মের কাছে মিষ্টির কদর ক্রমশ কমছে, মানছেন বিক্রেতা থেকে শুরু মিষ্টিরসিক জেলাবাসী। তবুও জিআই মার্ক বা পেটেন্ট হলে ঐতিহ্যের হাত ধরে হয়তো এই রসকদম্বের মাধ্যমেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে মালদার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন শিল্প, এমনই মত ওয়াকিবহাল মহলের।