রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি, ১০ জুলাই : মানুষকে পরিসেবা দেওয়ার নামে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সিন্ডিকেটরাজ চলছে। যে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ১২০০-১৫০০ টাকা ভাড়া হওয়ার কথা, সেখানে রোগীর পরিবারের কাছে দ্বিগুণ, তিনগুণ টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দাবি মতো ভাড়া না দিয়ে অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেওয়াও সম্ভব নয়। কেননা সিন্ডিকেটের ইশারা ছাড়া কোনো অ্যাম্বুলেন্সেরই চাকা ঘুরবে না। এমনকি ইচ্ছে হলেই বাইরে থেকে অ্যাম্বুলেন্স এনে রোগীকে নিয়ে যেতে দেবে না এখানকার সিন্ডিকেটের দাদারা। অগত্যা দাবি মানতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

অথচ পুরো বিষয়টিই ঘটছে মেডিকেল কর্তৃপক্ষের সামনেই। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয় না, বরং সিন্ডিকেটের অফিস চালানোর জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই অবস্থায় বিরক্ত সাধারণ মানুষ। মেডিকেল সুপার ডাঃ কৌশিক সমাজদার অবশ্য বলেন, আমার কাছে এই নিয়ে কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই সিন্ডিকেট সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

মেডিকেলে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স বলতে শুধুমাত্র মাতৃযান রয়েছে। যেগুলি আবার শুধুমাত্র প্রসূতিদের জন্যই ব্যবহার করা হয়। ফলে গুটিকয়েক সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সই একমাত্র ভরসা। মেডিকেলে প্রায় ১২০টির মতো বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। যেগুলিকে নিয়ে তৈরি হয়েছে সুশ্রুত সোশ্যাল অ্যাম্বুলেন্স পরিসেবা নামে সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই রোগীদের পরিসেবা দেওয়ার নামে কার্যত শোষণ চলছে। অভিযোগ, এখান থেকে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে শিলিগুড়ি শহরে যাতাযাত করতেও ৮০০-১০০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।

কোচবিহার থেকে রোগী নিয়ে মেডিকেলে চিকিৎসা করাতে এসেছেন অমর সরকার। তিনি বললেন, মাথাভাঙ্গা হাসপাতাল থেকে আমার রোগীকে মেডিকেলে রেফার করা হয়েছিল। আমরা কোচবিহারে না নিয়ে রোগীকে ভালো চিকিৎসার জন্য উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে নিয়ে এসেছিলাম। মাথাভাঙ্গা থেকে এখানে আসার সময় ভাড়া নিয়েছিল ২৫০০ টাকা। আর এখন রোগীকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ৫০০০ টাকা ভাড়া চাইছে। আমি অত টাকা দিতে পারব না জানানোর পরে ওরা ৪৫০০ টাকা দাবি করে। ওই টাকা না দিলে কোনো অ্যাম্বুলেন্স যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। আমরা চাষ করে খাই। এত টাকা দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করার মতো সাধ্য নেই। ভাবছি কষ্ট করে বাসেই চলে যাব।

জলপাইগুড়ির পান্ডাপাড়ার বাসিন্দা অঞ্জলি দে বলেন, গত ছয় মাস ধরে বাবাকে নিয়ে বেশ কয়েকবার অ্যাম্বুলেন্সে যাতায়াত করছি। এখানে তো বাইরের অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতেই দেওয়া হয় না। বাইরে থেকে অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিয়ে এলে বেশি সময় সেটিকে দাঁড়াতে পর্যন্ত দেওয়া হয় না। রোগীকে নামিয়ে মেডিকেল চত্বর ছাড়তে হয়। আর এখান থেকে অ্যাম্বুলেন্স নিতে গেলে প্রচুর টাকা বেশি দিতে হবে। উপায় নেই, এদের কাছে অ্যাম্বুলেন্স না নিয়ে বাইরে থেকে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতেও দেবে না। এগুলি তো কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত। মানুষকে এরা দিনের পর দিন শোষণ করছে।

রোগীর পরিজনদের অভিযোগ, এই অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের সঙ্গে শিলিগুড়ি এবং সংলগ্ন এলাকার নার্সিংহোমগুলির চুক্তি রয়েছে। মেডিকেল বা হাসপাতাল থেকে রোগীকে ভুলিয়ে নার্সিংহোমে নিয়ে ভরতি করলেই মোটা টাকা কমিশন হাতে হাতে পান অ্যাম্বুলেন্সচালকরা। অথচ এত অভিযোগের পরেও মেডিকেলের ওযার্ড মাস্টারের ঘর সংলগ্ন করিডরের পাশে শেড বানিয়ে সেখানে বসেন সিন্ডিকেটের নেতারা। তাৎপর্যপূর্ণভাবে সেই শেডে আলো, পাখা চালানোর জন্য বৈদ্যুতিক সংযোগও দেওয়া হয়েছে। ওই সিন্ডিকেট অর্থাৎ সুশ্রুত সোশ্যাল অ্যাম্বুলেন্স পরিসেবা সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক পাপ্পু ঘোষ এবং গোবিন্দ ভগৎ ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ মানতে চাননি। তাঁরা বলেন, আমরা ন্যায্য ভাড়ায় যাই। এমনকি গরিব মানুষকে বিনামূল্যে পরিসেবাও দিই।