মমতা ৩.০-র শুরুতেই কলঙ্কিত দাদাগিরিকে নিশ্চিহ্ন করুন দিদি

208

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

সেই সংলাপটা অন্তহীন হাহাকারের। জলদাপাড়া জঙ্গলের সামান্য দূরে, মাদারিহাটে ছোট হোটেল চালান এক দম্পতি। স্ত্রীই বেশি সোচ্চার। ভোটের আগে ভদ্রমহিলাকে বলতে শুনেছিলাম, দিদিকে দেখে বুঝছি, লোকের বেশি উপকার করতে নেই, জানেন? আজকাল লোকের চাহিদার শেষ নেই। কাউকে দশ হাজার টাকা দিলে শুনবেন, পাশের জন কেন এগারো হাজার পেল?

- Advertisement -

তখনই ওঁরা বুঝতে পারছেন, উত্তরবঙ্গে দিদি-বাতাস অনেক ম্লান। দোকানে যাঁরা খেতে আসছেন, ওই সময় গেরুয়া গুণগানে ব্যস্ত। আর পদ্মবাগানে বসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-ভক্ত স্বামী-স্ত্রীর মুখে স্পষ্টতই আক্ষেপ, ফালাকাটা শহরটা দিদি পালটে দিয়েছেন। সেখানে পর্যন্ত শুনছি, দিদি হারবেন। ফালাকাটার দাদাদের দোষে।

অন্য শহর, অন্য রাস্তা। পরবর্তী সংলাপে মিশে বল্গাহীন ক্রোধ।

মেখলিগঞ্জে তিন বিঘা করিডরের পথে ভরসন্ধেয় সেদিন গাড়ি খারাপ। সীমান্তবর্তী গ্রামে ঢোকার মুখে চায়ের দোকানে বাঁশের বেঞ্চে বসা এক সাদা দাড়ির প্রবীণ। মমতার নাম শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে চেঁচাচ্ছিলেন, একদম মমতারে ভোট নয়। একটা সুবিধে পাই নাই। সব ওর দলের লোক পাইস্যে। পাশের লোকটি প্রবীণ-ভাতা পেয়েছেন। শুনে আরও ক্ষিপ্ত সাদা দাড়ি। তৃণমূলের স্থানীয় নেতাকে গালাগাল দিয়ে মন্তব্য, তুই পাইছিস ওরে ধইরা। ওরে ধরতে হবে ক্যান সরকারি টাকা পাইতে?

তৃতীয়পর্বের শুরুতে কোভিড সামলানো যদি মমতার এক থেকে দশ নম্বর কাজ হয়, তা হলে এগারো থেকে কুড়ি নম্বর কাজ অবশ্যই হওয়া উচিত এই সমস্ত স্থানীয় দাদাদের চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়া। মমতার প্রতি তীব্র সহানুভূতিশীল বহু মানুষকে কামাখ্যাগুড়ি, হ্যামিল্টনগঞ্জ, বীরপাড়া, দোমহানীর রাস্তায় উত্তরবঙ্গীয় ডায়ালেক্টে বলতে শুনেছি, দিদিটো খুব ভালো। ওরে ডুবাইল ওর ভাইগুলা।

ভাইগুলা মানে কারা? গ্রামে-শহরে তৃণমূলের কলার তোলা, সোনার চেন পরা পার্টির দাদারা, মন্ত্রী, বিধায়ক, পঞ্চায়েত প্রধানরা। যারা ইচ্ছেমতো স্বাস্থ্যসাথী, রূপশ্রী, কন্যাশ্রী, বিধবা ও প্রবীণ ভাতা বিলি করে শুধু কাছের লোককে। সবার বাড়ির সামনে কেঁচো সার, গাছ লাগানোর প্রকল্প থেকে পুকুরচুরি করে। মমতার যাবতীয় সদিচ্ছা মাঠে মারা যায়। অজস্র প্রকল্পের সুবিধে পায় না জনতা। আর এই চুরির সময় সব পার্টির নেতারা এক হয়ে যান।

উইন্ডোজ ৩.০ ছিল উইন্ডোজের তৃতীয় সংস্করণ, যা বাণিজ্যিক এবং টেকনিকালি সবচেয়ে নিখুঁত।  এইভাবে প্লে স্টেশন ৩, আইফোন ৩ জিএস, টেসলা ৩ বা মিশন ইমপসিবল ৩ সিনেমা সুপারহিট। মমতা ৩.০-র কাছে তেমনই প্রত্যাশা। তিনি এখন দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে রাজধর্ম পালন করবেন, এমন আশা এই সময়ে না করলে কখন করব? তৃণমূল নেত্রী থেকে জাতীয় নেত্রী বিশেষণে উত্থানের আদর্শ সময় এটাই।

হাজার কোটি নিয়ে প্রচার যুদ্ধে নামা মোদি-শাকে স্তব্ধ করে মমতা এখন আক্ষরিক অর্থেই স্টেটসম্যান, বাংলায় বললে জননায়ক। বিধানচন্দ্র রায় বা জ্যোতি বসুর মতো। জাতীয় নেত্রী হতে চাইলে দলের ঊর্ধ্বে উঠে প্রথমেই গ্রাম-শহরের জামার কলার তোলা ভাইদের ছেঁটে ফেলা উচিত মানবিক মমতার।

বিজেপি শক্তিশালী হওয়ায় বাংলায় রাজনৈতিক সংঘর্ষে এখন সাম্প্রদায়িক রং লাগবেই। মমতার দাদা-ভাইরা অশিক্ষিত হলে তারা ফাঁদে পা দেবে। এবং গ্রাম জ্বলবে। রাজনৈতিক সংঘর্ষ আমূল মুছে দিতে হবে, সব পার্টির নেতা-আধা নেতাদের সমান শাস্তি দিয়ে বোঝানো দরকার, তুমি তৃণমূল মানেই যা খুশি করার অধিকার নেই।  আসলে দাদাগিরি এবং সিন্ডিকেটরাজ একই সুতোয় গাঁথা। একটা বন্ধ হলে অন্যটা বন্ধ অনিবার্য। আর দুটোই বন্ধের জন্য আরও দুটো দিকে মন দরকার। চাকরি তৈরি এবং শিক্ষায় মসৃণতা। অনিলায়নের পর পার্থায়নে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা বিধ্বস্ত। ভোটের আগে জয়গাঁ থেকে তিনবিঘা, কামাখ্যাগুড়ি থেকে বুনিয়াদপুর যাওয়ার সময় গ্রামীণ রাস্তাগুলো দেখে অবাক লাগত। এ যে বিদেশের মতো মসৃণ। চোখ ও মনকে শান্তি দিয়ে সে রাস্তায় দল বেঁধে পড়তে যায় কিশোরীর দল। কন্যাশ্রীতে পাওয়া সাইকেলে সবাই। সিতাই, হলদিবাড়ি, গজলডোবার সেতুগুলো তো মানচিত্র পালটে দিয়েছে এলাকার। মমতার শাসনকালেই এসব উন্নয়ন।

তবু মানুষ কেন তৃণমূলে তিতিবিরক্ত ছিল উত্তরবঙ্গে? এই ভোট যেমন ভাগ করে দিয়েছিল হিন্দু-মুসলমান, তেমন বিভেদ দেখাল উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মানুষের মনোভাবে। উত্তরের সব শহরে এক কথা শুনতাম। এইসব প্রকল্প থেকে স্থানীয় নেতাদের পকেটে গিয়েছে অনেক টাকা। যা দেখে স্থানীয় মানুষ মারাত্মক ক্ষিপ্ত। দিদি সাধারণ জীবনযাপন করছেন, আর উদ্ধত ভাইয়েরা এক একজন তিন-চার তলা বাড়ি করে ফেলেছেন। হিলি বা চ্যাংরাবান্ধা সীমান্তে সব অবৈধ ব্যবসায় যে তাঁরা নিজেরা জড়াচ্ছেন, তাই-ই নয়, সব কিছুতে জড়িয়ে দিচ্ছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। তাঁর নাম করলে পুলিশও কিছু করবে না, সম্ভবত অঙ্কটা এই।

বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসব হিমালয় সমান ক্ষোভ কি নবান্নে পৌঁছায়নি? অভিষেকের নিজেরও দেখা উচিত, পার্টির কারা তাঁর নাম ব্যবহার করে আসানসোল থেকে হিলি, বসিরহাট থেকে চ্যাংড়াবান্ধা অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পুরো উত্তরবঙ্গে মমতা যতবার এসেছেন, এর আগে কোনও মুখ্যমন্ত্রী আসেননি। কলকাতার কোনও মন্ত্রী এত ভালোবাসাও দেখাননি লামাহাটা, গজলডোবা, তিস্তা, সুকনার জন্য। তবু তাঁর দলকে বারবার শিলিগুড়ি বা দার্জিলিংয়ে শূন্য হাতে ফিরতে হয় কেন?  উত্তরবঙ্গে তাঁর কোনও মন্ত্রী চরম ঔদ্ধত্য দেখান, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দেখাই করেন না। কোনও মন্ত্রী জঙ্গলের বেআইনি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে যান। কোনও মন্ত্রী গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মেটানোর বদলে জিইয়ে রাখেন। কোনও মন্ত্রী কলকাতা থেকে এসে এমন কিছু করেন, যা কেচ্ছার পর্যায়ে চলে যায়। এঁরাও তো দাদা, এঁরাও তো ভাই। ওই যে মমতার জন্য বিহ্বল মধ্যবয়স্কা খুব ম্লান গলায় বলেন, দিদিটো খুব ভালো, ভাইগুলাই ওরে ডুবাইল তাতে কিন্তু মন্ত্রীদেরও তিক্ত স্মৃতি থাকে।

মমতা ৩.০ যুগে পা রেখে শহর-গ্রামে দাদাগিরি দেখে প্রশ্ন জাগে, এখানেও কি নবীন পট্টনায়েকের নীতিই আদর্শ? মমতার মতো সারাক্ষণ দৌড়ঝাঁপ আদৌ করেন না ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী। মমতা জনসংযোগে ১০০-তে ১০০ পেলে, নবীন পাঁচও পাবেন না। তবু পবন চামলিং, জ্যোতি বসুর টানা মুখ্যমন্ত্রিত্ব করার রেকর্ড ভাঙার দাবিদার বিজু তনয়। তাঁর মন্ত্রীদের নাম লোকে জানতেও পারেন না। নবীন রাজ্যটা চালান সৎ আমলাদের দিয়ে যা এ বাংলায় সম্ভব নয়। কিন্তু কিছু দাদাদের কাজকর্ম দেখে মনে হয়, মমতা এই পথ নিয়ে ভাবতেও পারেন। কিছু সৎ আমলাই প্রকল্পের বিলি করুন পার্টি না দেখে। দাদা-ভাইয়ের দাপট বন্ধ করার এটাই সহজতম উপায় হতে পারে। তখন আর শুনতে হবে না, দিদিটো খুব ভালো, ভাইগুলাই ওরে ডুবাইল।

ভাই বলুন বা দাদা-এই ভাইগিরি আর দাদাগিরিই বাংলার ক্রমশ তলিয়ে যাওয়ার কারণ। এদের জন্যই পাড়ায় পাড়ায় তোলাবাজি, কনট্রাক্টরগিরির অভিযোগ ওঠে। যে কোনও ঝামেলা ঘিরে অকারণ উত্তেজনা তৈরি, সাম্প্রদায়িক রং লাগানোর পিছনেও তারা। মমতা ৩.০ যুগে এই দাদাগিরিরই অবসান দরকার। দরকার মন্ত্রী ও কনট্রাক্টর আঁতাতের অবসান। যে অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা অনেকেই মমতার চারপাশে ঘোরেন। মানুষ বাছায় মমতা ভুল করেন অনেক সময়ই। শুভেন্দু, মুকুল, রাজীব, সোনালি, বৈশালিদের মতো চরম অকৃতজ্ঞরা যে জন্য গাছে উঠে পড়েন।

প্রশস্ত রাজপথ, জয়ী সেতু, মানসাই সেতু মমতার আমলে উত্তরবঙ্গে বড় মাইলফলক। স্থানীয় নেতাদের অধিকার নেই, এসব প্রকল্পের পাশে গ্রামীণ প্রকল্পে টাকা মেরে নেত্রীর কৃতিত্ব মুছে দেওয়ার। সেটাই হয়েছে। প্রয়োজনে পঞ্চায়েত প্রধান, পুরপিতা, বিধায়কদের কাছে পুরো হিসেব নেওয়ার ব্যবস্থা করুন মুখ্যমন্ত্রী। যাতে আর কেউ না বলতে পারে, সেতু যেমন হয়েছে, নেতাদেরও উন্নয়ন হয়েছে টাকা চুরি করে।

মমতা ১.০ জমানার সারদা-নারদ কেলেঙ্কারির ভুল পরে আর করেননি মমতা। আশা করা যাক, তাঁর ভাইদের দাদাগিরি ও তঞ্চকতার দিনও শেষ হবে এই আমলে। মমতা ৩.০ অবশ্যই যাবতীয় ক্ষুদ্র দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জননায়ক হওয়ার আদর্শ সময়।