সোনা আনছে কুড়িয়ে পাওয়া সোনার ছেলে 

1207

রাঙ্গালিবাজনা : আশ্রয়  ছিল না একরত্তি ছেলেটার !  পরিচয় ছিল পথশিশু হিসেবে। কালীপুজোর সময় বছর ছয়েকের ছেলেটাকে উদভ্রান্তের মতো পথে ঘুরতে দেখে ঘরে এনেছিলেন বীরপাড়ার প্রশান্ত নাহা । নিজেদের ছেলেপুলে থাকা সত্ত্বেও একটি পথশিশুকে কোলে টেনে নিতে দ্বিধা করেননি প্রশান্তবাবুর স্ত্রী শিবানীদেবী। বীরপাড়ার একসময়ের  সেই পথশিশু প্রকাশের হাত দিয়ে আসা পদকে এখন নাহা পরিবারের আলমারি ভরে গিয়েছে। এবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে রাজ্য অ্যাথলেটিকস মিটে অনূর্ধ্ব ১৪ বছরের বিভাগে ট্রাইথেলেনে বৃহস্পতিবার স্বর্ণপদক পেয়েছে প্রকাশ। শুক্রবার ১০০ মিটার দৌড়ে ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে সে। রাঁচিতে জাতীয়স্তরের প্রতিযোগিতায় রাজ্যের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবে সে। প্রকাশকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত আলিপুরদুয়ার জেলার বীরপাড়ার বাসিন্দারা।

প্রকাশের বাবা কেকলে থাপা মারা যান যখন প্রকাশের বয়স আড়াই বছর। বাড়ি ছেড়ে চলে যান তার মা। ফলে, প্রকাশের না ছিল আশ্রয়, না ছিল দু-মুঠো খাবার। ২০১১ সালে প্রশান্তবাবুর নজরে পড়ে সে। তাকে বাড়িতে তুলে ২০১২ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভরতি করিয়ে দেন প্রশান্তবাবু। এরপর থেকে আর পিছন ফিরে তাকায়নি প্রকাশ। বর্তমানে বীরপাড়া হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সে।

- Advertisement -

প্রকাশের সাফল্যের তালিকাটা বেশ চোখ ধাঁধানো। ২০১৬ সালে বীরপাড়া হাইস্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘খেলো ইন্ডিয়া’ প্রতিযোগিতায় আলিপুরদুয়ার জেলায় অনূর্ধ্ব ১২ বছরের বিভাগে ১০০ মিটার ও ২০০ মিটার দৌড়ে প্রথম হয় সে । ২০১৭ সালে ময়নাগুড়িতে অনুষ্ঠিত জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও লং জাম্পে সোনা ও সেই বছরই আলিপুরদুয়ারে জেলা আন্ত:ক্লাব মিটে অনূর্ধ্ব ১৪ বছরের বিভাগে ১০০ মিটার দৌড়ে ও লং জাম্পে সোনা জেতে সে । ২০১৮ সালে জলপাইগুড়িতে অনূর্ধ্ব ১৪ বছরের বিভাগে ১০০ মিটার ও ৬০০ মিটার দৌড়ে প্রথম হয় এবং সে বছরই বালুরঘাটে অনুষ্ঠিত আন্ত:জেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার ও ২০০ মিটার দৌড়ে সোনা জেতে । সে বছর কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ৬৮ তম রাজ্য অ্যাথলেটিকস মিটে ৬০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় এবং শটপাট ছোঁড়ায় তৃতীয় স্থান পায় প্রকাশ। গত বছর তিরুপতিতে অনুষ্ঠিত ষোড়শ জাতীয় জুনিয়র আন্ত:জেলা অ্যাথলেটিকস মিটে আলিপুরদুয়ার জেলার প্রতিনিধিত্ব করে প্রকাশ। এবছর ট্রাইথেলনে সোনা পেল প্রশান্তবাবুর কুড়িয়ে পাওয়া ‘সোনার ছেলে’।

বীরপাড়া হাইস্কুলের পরিচালন সমিতির সভাপতি পঙ্কজ দাস বলেন, ‘প্রকাশকে নিয়ে আমরা গর্বিত। কলকাতা থেকে ফিরলেই তাকে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে  সংবর্ধনা দেওয়া হবে।’ বীরপাড়া হাইস্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক মনোজ গুহ বলেন, ‘প্রকাশ ভীষণ অধ্যাবসায়ী এবং সম্ভাবনাময়। আশা করছি, জাতীয় স্তরে সে আমাদের মুখ ঊজ্জ্বল করবে।’ একসময় পথে পথে ঘুরে বেড়ানো ছেলেটা জানে কষ্ট কী। জানে, আপন কেউ না থাকার দুঃখ। আর জানে, সেই সাফল্যই গোটা আলিপুরদুয়ার জেলার কাছে তাকে আপন করে দিয়েছে। ‘আমাকে আরও অনেকদূর যেতে হবে’, মন্তব্য স্বল্পভাষী প্রকাশের।

 

ছবি – স্বর্ণপদক পাওয়ার পর প্রকাশ

ছবি ও তথ্য – মোস্তাক মোরশেদ হোসেন