ভাইকে স্কুলে পাঠাতে সাইকেলে ফেরিওয়ালা তাপসী

802

ভাস্কর শর্মা, আলিপুরদুয়ার : মা-বাবা হারা একমাত্র ভাইকে আগলে রেখে তিনি এগিয়ে চলেছেন জীবন সংগ্রামে। এ যেন আজকের দিনে দুর্গার এক অসম লড়াই। নানা প্রলোভন, নানা হাতছানিকে দূরে সরিয়ে রেখে ধূপকাঠি ও ইমিটেশনের গয়না ফেরি করে নতুন স্বপ্নের জাল বোনেন রোজ। তাঁর বাহন বলতে ভাঙাচোরা একটি সাইকেল। একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় জীবনযুদ্ধে থমকে গিয়েছে তাঁর লেখাপড়া। সারা বছর রোদ-বৃষ্টি-শীতকে উপেক্ষা করে দুবেলা দুমুঠো ভাতের জোগাড় করতে তিনি ছুটে চলেছেন শহরের অলিগলি থেকে গ্রামের পথে। কোনও কোনওদিন লাভের ভাঁড়ারটা শূন্যই থাকে। আবার কখনও সামান্য আয় হলেই মুখে ফুটে ওঠে হাসি। আলিপুরদুয়ার শহরের জীবন সংগ্রামের আরেক নাম তাপসী দাস। শহরের সুতলিপট্টি এলাকার বাসিন্দা তাপসীদেবীর সংগ্রামের কথা এখন সকলের মুখে মুখে ফেরে।

আলিপুরদুয়ার শহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তাপসীদেবীর ভাই উজ্জ্বল সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। অভাব-অনটন তাঁদের নিত্যসঙ্গী। তাপসীর বাবা যখন যে কাজ পেতেন তাই করতেন। মা বাড়িতেই সংসার সামলাতেন। সংসারে ছোট হলেও অনেক আগে থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারে সাহায্য করতে হত তাপসীকে। মা বাদাম ভেজে দিতেন। ওই বাদাম ভাজা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন তিনি। একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়ে। মা সুচিত্রাদেবীর ধরা পড়ে ক্যানসার। নিত্য অভাবের সংসারে মায়ের চিকিৎসা করানোর অর্থও তাঁদের ছিল না। ফলে প্রায় বিনা চিকিৎসায় ২০১৫ সালে সুচিত্রাদেবীর মৃত্যু হয়। মা-হারা দুই সন্তানকে নিয়ে বাবাও বেকায়দায় পড়েন। তখন থেকেই সংসারের হাল ধরতে হয়। ২০১৮ সালে ফের ঘটে অঘটন। বাবা শ্রীরূপ দাসের মৃত্যু হয়। জীবন সংগ্রামে হেরে যাওয়ার পাত্রী নন তাপসী। ছোট ভাইকে মানুষ করতে ফের লড়াই শুরু হয় তাঁর। প্রতিদিন এই সাইকেল নিয়ে তিনি পাড়ি দেন ৩০ থেকে ৫০ কিমি পথ। ওই সাইকেলের দুপাশেই ঝোলানো থাকে ব্যাগ। ব্যাগের ভিতর থাকে ধূপকাঠির বাক্স। সেইসঙ্গে আছে নানা ধরনের সাজগোজের উপকরণ।

- Advertisement -

শুক্রবার আলিপুরদুয়ার শহরে ধূপকাঠি বিক্রি করতে করতেই নিজের জীবন সংগ্রামের কাহিনী জানিয়েছেন। তাপসী বলেন, অভাব-অনটন ছোট থেকেই দেখেছি। মা-বাবা হারানোর পর তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাই কিছু না ভেবে সাইকেল নিয়ে ঘুরে ঘুরে ধূপকাঠি ও নকল গয়না বিক্রি করতে শুরু করি। চার বছর ধরে একাজ করছি। এখন নিজের ব্যবসাকে আরও বাড়াতে স্বপ্ন দেখছেন তাপসী। তবে সরকারি ঋণের কথা তিনি ভাবেন না। কারণ ঋণ নিয়ে শোধ দিতে না পারলে বোঝা আরও বাড়বে। আবার ভাইকে মানুষ করতে হলে চাই আরও টাকা। ব্যবসা না বাড়াতে পারলে টাকাও বাড়বে না। তাই সেই স্বপ্নেই নিজের সাইকেলে উঠে ফের শহরের অন্য গলিতে ধূপকাঠি বিক্রি করতে রওনা দেন তাপসী।