জ্যোতি সরকার সানি সরকার, জলপাইগুড়ি শিলিগুড়ি : কাশ্মীর ইশ্যুতে দুই দেশের মধ্যে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন নয়, ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে পাকিস্তান। আর তাতেই শিল্পে অশনি সংকেত দেখছে উত্তরবঙ্গের চা মহল। পাক মুলুকে চা রপ্তানি করা সম্ভব না হলে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, পরবর্তীতে বাজার পাওয়ার ক্ষেত্রে মাশুল গুনতে হবে বলে মনে করছেন উত্তরবঙ্গের চা শিল্পপতিরা। তবে আর্থিক ক্ষতি হলেও, দেশের অখণ্ডতার প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন তাঁদের অনেকেই।

গুনগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে উত্পাদন খরচ অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। এরই মধ্যে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চা বাগানগুলিতে দেখা দিয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ এবং শুরু হয়েছে জোরালো আন্দোলন। বিষয়টি নিয়ে য়খন উদ্বেগের ছায়া চা বাগানে, তখনই কাশ্মীর ইশু্য়তে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিল করল পাকিস্তান, যার বড়ো প্রভাব পড়তে চলছে চা শিল্পে। পাকিস্তানে চা রপ্তানি বন্ধ থাকলে ব্যবসায়িক দিক দিয়ে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন চা শিল্পপতিরা। মূলত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তাঁরা বেশি উদ্বিগ্ন। কেননা, একবার বাজার হাতছাড়া হলে সেই বাজার ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে চরম সমস্যায় পড়তে হবে। এই সুযোগে বাজার ধরবে চা উত্পাদনকারী অন্য দেশগুলি। জানা গিয়েছে, উত্তরবঙ্গের উৎপাদিত চায়ের মধ্যে সিটিসির কদর রয়েছে পাক মুলুকে। প্রতি বছর এখান থেকে প্রায় ২৮ মিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি করা হয় পাকিস্তানে। চলতি আর্থিক বছরে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৬ মিলিয়ন চা রপ্তানি করা হয়েছে। শিলিগুড়ি টি অকশন সূত্রে জানা গিয়েছে, ডুয়ার্সের চা ১৭২.২৩ টাকা এবং তরাইয়ে চা প্রায় ১৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে জুলাই মাস পর্যন্ত। পাকিস্তানে এই চা প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয় বলে চা শিল্পপতিদের বক্তব্য। নর্থবেঙ্গল টি প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েনের সভাপতি প্রবীর শীল বলেন, পাকিস্তানে চা রপ্তানি করতে না পারাটা ব্যবসায়িক দিক দিয়ে অনেকটাই ক্ষতি। সহজে এই ক্ষতি পূরণ সম্ভব নয়। তবে দেশের অখণ্ডতা সবার আগে। ভারতীয় চা রপ্তানি না হলে পাকিস্তানের বাজার ধরবে নেপাল এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। যেহেতু উত্তরবঙ্গের সঙ্গে নেপালের ভৌগোলিক অবস্থা এবং আবহাওয়া অনেকটাই এক। তাই গুণগত মানের ক্ষেত্রে এখন আর তেমন পার্থক্য নেই। কিন্তু দাম অনেকটাই কম। ফলে নেপাল যদি পাকিস্তানের বাজার ধরে নেয় তবে সমস্যায় পড়তে হবে বলে মনে করছেন অনেক চা শিল্পপতি। ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েনের ডুয়ার্স শাখার সচিব সুমন্ত গুহঠাকুরতা বলেন, রপ্তানি বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতেই হবে। তবে সবার আগে আমাদের কাছে দেশের স্বার্থ বড়ো। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিলের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্থানের অবস্থান নিন্দনীয়। ভারতীয় চা পাকিস্তানে রপ্তানি করর জন্য ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েন ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানে ভারতীয় চা রপ্তানি হচ্ছিল। পাকিস্তানের অবস্থানের জন্যই চায়ের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ক্ষুদ্র চা চাষি সমিতির সর্বভারতীয় সভাপতি বিজয়গোপাল চক্রবর্তী বলেন, ভারতের উৎপাদিত চায়ের ৫০ শতাংশ ক্ষুদ্র চা বাগানগুলির। বৃহৎ চা বাগানগুলির পাশাপাশি ক্ষুদ্র চা বাগান পরিচালন গোষ্ঠীও রপ্তানি বাণিজ্যের প্রসারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে য়াচ্ছে। সুবিধাজনক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান ভারত থেকে বেশি মাত্রায় চা কেনেনি। পাকিস্তানের জন্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। পাকিস্তানে ভারতীয় চা রপ্তানি ধাক্কা খাবে। কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ (সিআইআই)-এর উত্তরবঙ্গ জোনের চেয়ারম্যান আনন্দ আগরওয়াল বলেন, বর্তমান সময়ে চা শিল্পে মন্দা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তে বড়ো ধাক্কা খেল উত্তরবঙ্গের চা শিল্প। জানি না ক্ষতিপূরণ কী করে হবে। তবে নিজেদের স্বার্থেই পাকিস্তান বর্তমান সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে বলে আমরা আশাবাদী।