চা বাগানে গ্রুপ হাসপাতাল গড়ার সুপারিশ এখনও বিশবাঁও জলে

210

শিলিগুড়ি : চা বাগান ধরে ধরে সমীক্ষার পর উত্তরবঙ্গের নথিভুক্ত ২৭৬টি চা বাগানের জন্য ৩২টি গ্রুপ হাসপাতাল এবং ৭টি সেন্ট্রাল গ্রুপ হাসপাতাল তৈরির সুপারিশ করেছিল রাজ্য শ্রম দপ্তর। কোন কোন চা বাগানের জন্য কোথায় হাসপাতাল তৈরি হবে, সেটাও স্পষ্ট করে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছিল। হাসপাতাল তৈরি এবং পরিচালনার জন্য অর্থের জোগান কোথা থেকে হবে তারও নিদান দিয়েছিলেন শ্রম দপ্তরের কর্তারা। উত্তরবঙ্গের কয়েক লক্ষ চা শ্রমিকের উন্নয়নে শ্রম দপ্তরের এই সুপারিশ আজও কার্যকর হয়নি। ছয় বছর ধরে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে সুপারিশের কথা। করোনা পরিস্থিতিতে গ্রুপ হাসপাতালের প্রযোজনীয়তার কথা তুলে সরব হয়েছে চা শ্রমিক সংগঠনগুলি। করোনার চিকিৎসায় বারবার পরিকাঠামোগত অভাবের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। গ্রুপ হাসপাতালগুলি তৈরি হলে উত্তরবঙ্গে সেই সমস্যা অনেকটাই মেটানো সম্ভব হত বলে মনে করছেন চিকিৎসকদের একাংশ।

বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের টি অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহন শর্মা। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে গ্রুপ হাসপাতাল তৈরির বিষয়ে রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী এবং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মলয় ঘটকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক হলেই ওই বিষয়ে পদক্ষেপ করা হবে।’ টি বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রভাতকমল বেজবড়ুয়া বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। আমাদের পক্ষ থেকে যা যা করণীয় তা করা হবে।’ পাহাড় থেকে ডুয়ার্স উত্তরবঙ্গের প্রতিটি চা বাগান ধরে বিশেষজ্ঞ দল তৈরি করে সমীক্ষা করেছিল রাজ্য শ্রম দপ্তর। সেই সমীক্ষার নির্যাস হিসাবে চা শিল্পের উন্নতি এবং শ্রমিকদের জীবনয়াত্রার মানোন্নয়নের জন্য ১০ দফা সুপারিশ করেছিলেন শ্রম দপ্তরের কর্তারা। সেই সুপারিশগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল বাগানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন। সেক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বাগানের জন্য একটি করে গ্রুপ হাসপাতাল তৈরির কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি চা বলয়ে প্রতিটি মহকুমায় একটি করে সেন্ট্রাল গ্রুপ হাসপাতাল তৈরির সুপারিশও করেছিল রাজ্য শ্রম দপ্তর। সেই সুপারিশের কথা রাজ্য সরকারের পাশাপাশি টি বোর্ডকেও জানানো হয়েছিল। শ্রম দপ্তরের সরকারি সেই সমীক্ষায় চা বাগানগুলির স্বাস্থ্য কাঠামোর কঙ্কালসার চেহারা প্রকাশ্যে এসেছিল। সেই কারণেই গ্রুপ হাসপাতাল তৈরিতে গুরুত্ব দিতে বলেছিলেন সমীক্ষকরা।

- Advertisement -

সুপারিশ অনুসারে আলিপুরদুয়ার, মালবাজার, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, কার্সিযাং এবং কালিম্পংয়ে একটি করে সেন্ট্রাল গ্রুপ হাসপাতাল তৈরি কথা বলা হয়েছিল। গ্রুপ হাসপাতালগুলির তুলনায় সেন্ট্রাল গ্রুপ হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোরও পরিষেবা অনেকটাই উন্নত হবে তেমনটাই উল্লেখ করা হয়েছিল। ৩২টি গ্রুপ হাসপাতালে মধ্যে ২০টি ডুয়ার্সে, ৬টি তরাই এলাকায় এবং ৬টি পাহাড়ে তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, হাসপাতালগুলি তৈরি হবে চা বাগানের জমিতেই। তার জন্য প্রযোজনীয় পদক্ষেপ করবে সরকার। সুপারিশের ক্ষেত্রে টি গার্ডেন হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল বলে শ্রম দপ্তরের কর্তারা জানিয়েছেন। শ্রম দপ্তর তাদের সুপারিশে বলেছিল, গ্রুপ হাসপাতাল তৈরি, অ্যাম্বুল্যান্স সহ চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার জন্য টি বোর্ড আর্থিক সহযোগিতা করবে। পরবর্তী সময়ে হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে চা বাগান মালিকদের উপর।

সুপারিশের ছয় বছর পরেও কেন এখনও হাসপাতালগুলি তৈরি হল না? এই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর মেলেনি কারও কাছ থেকেই। শ্রমিক সংগঠন জযে্ট ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং টি গার্ডেন হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির প্রাক্তন সদস্য মণিকুমার দার্নাল বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সরকারি বৈঠকে শ্রম দপ্তরের সুপারিশ মেনে দ্রুততার সঙ্গে গ্রুপ হাসপাতালগুলি তৈরির কথা বলেছি। আজ পর্যন্ত রাজ্যের টি অ্যাডভাইজারি কাউন্সিল বা কেন্দ্রের টি বোর্ড কেউই ওই বিষয়ে পদক্ষেপ করেনি। করোনা মোকাবিলায় গ্রুপ হাসপাতালের প্রযোজনীয়তা সকলেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সরকারি গাফিলতিতেই আজ গ্রুপ হাসপাতালগুলি তৈরি হয়নি। দ্রুত শ্রম দপ্তরের সুপারিশ বাস্তবায়ন দরকার।’ চা বাগান মালিকদের সংগঠন টি অ্যাসোসিয়েন অব ইন্ডিয়ার তরাই শাখার সচিব সুমিত ঘোষ বলেন, ‘শ্রম দপ্তরের সুপারিশ বাস্তবায়নে বৃহত্তর উদ্যোগের অভাব আছে। সবাইকে নিয়ে আলোচনা করে দ্রুত চা বলয়ে চিকিৎসা কাঠামো উন্নয়নে পদক্ষেপ করা দরকার। গ্রুপ হাসপাতাল তৈরির বিষয়ে আমরা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করব।’

তথ্য-শুভঙ্কর চক্রবর্তী