উত্তরবঙ্গ ব্যুরো, ৯ জুলাই : ব্যাংক থেকে বছরে এক কোটির বেশি নগদ টাকা ওঠালে শতকরা দুই শতাংশ হারে উৎসমূলে কর (টিডিএস) কেটে নেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় বাজেটে এমন প্রস্তাবে চা মহল অশনিসংকেত দেখছে। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের পেশ করা বাজেট প্রস্তাবে অবশ্য বড়ো অঙ্কের নগদ তোলা বাধ্যতামূলক এমন কিছু ব্যবসায় টিডিএস নাও লাগতে পারে বলে ইঙ্গিতও দিয়ে রাখা হয়েছে। তাতে অবশ্য উত্তরবঙ্গের প্রায় ৩০০ বাগান কর্তৃপক্ষের দুশ্চিন্তা কাটছে না। চার লক্ষেরও বেশি চা শ্রমিকের হাতে সময়মতো মজুরি তুলে দেওয়ার বিষয়ে বাগান কর্তৃপক্ষকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। টিডিএস-এর হাত থেকে চা মহল অব্যাহতি চাইছে। এই দাবিতে ইতিমধ্যেই শীর্ষ চা বণিকসভা ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশন (আইটিএ) কেন্দ্রীয় অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গকে চিঠি পাঠিয়েছে। পাশাপাশি, রাজ্যেরও হস্তক্ষেপের আর্জি জানিয়ে আইটিএ অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রকেও আরেকটি চিঠি পাঠিয়েছে।

আইটিএ জানাচ্ছে, চা বাগানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় শ্রমিকদের নগদেই মজুরি দেওয়া হয়ে থাকে। কেন্দ্রের বিমুদ্রাকরণ নীতির অঙ্গ হিসেবে একটা সময় চা শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মজুরি দেওয়ার কথা বলা হলেও তা ব্যাংকিং পরিকাঠামোর অভাবে সফল হয়নি। তাছাড়া শ্রমিক সংগঠনগুলিও নগদে মজুরি দেওয়ার শতাব্দীপ্রাচীন দস্তুর পরিবর্তনের পক্ষপাতী নয়। উত্তরবঙ্গ ও অসম মিলিয়ে চা শ্রমিকদের মজুরি দিতে বছরে আট হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। এর পুরোটাই ব্যাংক থেকে নগদে ওঠাতে হয়। ওই টাকার ওপর টিডিএস ধার্য্য হলে গোটা চা শিল্প মিলিয়ে একটা বড়ো অঙ্কের টাকা মূলধনি খাত থেকে বেরিয়ে যাবে।

কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে মজুরি নিতে চা শ্রমিকদের ব্যাংকে যেতে হবে। বহু চা বাগান সংলগ্ন এলাকায় ব্যাংক নেই। বাগানগুলি থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে ব্যাংক রয়েছে। ব্যাংকে গিয়ে টাকা তুলতে হলে শ্রমিকদের অনেক খরচ হবে। পাশাপাশি, ব্যাংকগুলির পরিকাঠামোগত দুর্বলতাও একটি বড়ো সমস্যা। উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিতে গড়ে এক হাজার শ্রমিক কাজ করেন। একসঙ্গে এক হাজার শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার পরিকাঠামো ব্যাংকের নেই। বিমুদ্রাকরণের সময় পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের বিভিন্ন চা বাগানে ব্যাংকের মাধ্যমে মজুরি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। সেই সময়ে শ্রমিকদের মজুরি পাওয়া নিয়ে দেরির জেরে অসন্তোষ ছড়িয়েছিল। এবারও একইরকম সমস্যা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।

আইটিএ-র ডুয়ার্স শাখার সচিব সুমন্ত গুহঠাকুরতা বলেন, ডুয়ার্স এলাকার চা বাগানগুলিতে শ্রমিকদের মজুরি ও বোনাস খাতে প্রতি বছর প্রায় ২০০ কোটি টাকা দিতে হয়। বিপুল অঙ্কের এই টাকা দীর্ঘকাল ধরেই কর্তৃপক্ষ নিজ নিজ বাগানগুলিতে শ্রমিকদের হাতে তুলে দিয়ে আসছে। বাগানগুলির ধারেকাছে ব্যাংক না থাকায় এবারে সমস্যা হতে পারে। টি অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (টিএআই)-র সেক্রেটারি জেনারেল প্রবীর ভট্টাচার্য বলেন, ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেনের উদ্যোগ সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু পরিকাঠামোর উন্নতি না করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে বাগান শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে সমস্যা হবে।

সংগঠনের ডুয়ার্স শাখার সম্পাদক রাম অবতার শর্মা বলেন, বেশিরভাগ বাগানই প্রত্যন্ত এলাকায় রয়েছে। সেখানে নেটওয়ার্ক সমস্যা রয়েছে। মুষ্টিমেয় কয়েকটি বাগানে এটিএম কাউন্টার বা কিয়স্ক পরিসেবা চালু করা হলেও এখনও সেগুলি খুব একটা সফল হয়নি। চা বাগিচা শ্রমিক ইউনিয়ন সমূহের জয়েন্ট ফোরামের নেতা মণিকুমার দার্নাল বলেন, বাস্তব অবস্থার পর্যালোচনা না করে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে চা শিল্পের ক্ষেত্রে মজুরি প্রদানে সমস্যা দেখা দিতে বাধ্য।