স্বপ্নেই থাকল বুদ্ধের টি টুরিজম, মমতার সুইৎজারল্যান্ড

809

জ্যোতি সরকার

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনোই শুধু কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করেন না। বিরোধী দলের নেত্রী থাকাকালীন কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার, ডায়মন্ড হারবার থেকে দার্জিলিং চষে বেড়িয়েছেন। ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও প্রায় সারাবছরই তাঁকে জেলায় জেলায় ঘুরে প্রশাসনিক বৈঠক করতে দেখা গিয়েছে। তিনি যখন বিরোধী নেত্রী ছিলেন, সেই সময়ে উত্তরবঙ্গে বেশ কয়েবার পেশাগত কারণে তাঁর কর্মসূচিগুলিতে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি ডায়ারি উপহার দিয়ে তাতে লিখে দিয়েছিলেন, Kalam must be used impartially for the development of people.  বাংলায় কলমকে তিনি ইংরেজিতেও কলমই লিখেছিলেন। উত্তরবঙ্গকে পর্যটনের নিরিখে সুইৎজারল্যান্ডের আদলে তৈরি করার অঙ্গীকার সেই সময় তিনিই  ঘোষণা করেছিলেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রায় ১০ বছর কেটে গিয়েছে, উত্তরবঙ্গের রাস্তাঘাটের যা হাল এখন, তাতে সুইৎজারল্যান্ডের মতো পরিকাঠামো তৈরি করা কবে সম্ভব হবে, তা নবান্নই বলতে পারে। প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ডু ইট নাউ-এর প্রবক্তা পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জুড়ি মেলা ভার। বুদ্ধবাবু উত্তরবঙ্গে টি টুরিজমের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এটা তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প।

- Advertisement -

প্রকল্পটি বুদ্ধবাবুর স্বপ্নেই থেকে গিয়েছে। এখনও কার্যকর হয়নি। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাম আমলে জমি জটিলতাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চা বাগান সম্পর্কে অনেকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন সময়ে প্যাকেজের কথা বলেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালীন নির্মলা সীতারামন বারকয়েক চা বাগান ঘুরে গিয়েছেন। কখনও বলা হয়েছে, চা অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আবার কখনও চা-কে কৃষিভিত্তিক শিল্প নাম দেওয়া হয়েছে। যে যা প্রতিশ্রুতিই দিন না কেন, চা শিল্প যে এখনও পুরোপুরি উপেক্ষিত, সেকথা বললে অত্যুক্তি হবে না। দীর্ঘদিন হয়ে গেল, চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি চুক্তিই হচ্ছে না। এর নির্ধারিত সময় কবে পার হয়ে গিয়েছে। বর্ধিত মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়ে আছেন চা শ্রমিকরা। উত্তরবঙ্গে তাঁদের সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। তিন লক্ষের বেশি। উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিতে কমপক্ষে ৪০ হাজার হেক্টর জমি পতিত পড়ে রয়েছে। এই জমিগুলি ব্যবহারের কোনও উদ্যোগ নেই। শাসকদল এবং বিরোধী- উভয়ই উন্নয়নের কথা বলে। এতে কতটা আন্তরিকতা আছে, তা অভিজ্ঞতার নিরিখে এখন উপলব্ধি করতে পারেন উত্তরবঙ্গের বাসিন্দারা। ১৯৯৮-৯৯ সালে চা-এর বাজার ছিল তেজি। বলা হয়, সেই সময় চায়ের স্বর্ণযুগ ছিল। চা শিল্পপতিদের একটি অংশ মোটা অঙ্কের লাভের টাকা চা শিল্প থেকে সরিয়ে অন্য শিল্প গড়ার কাজে বিনিয়োগ করেছেন। তাতে তাঁদের পকেট মোটা হয়েছে। কিন্তু পরিণতিতে চা শিল্প রুগ্ন হয়েছে।

সেসময় কেউ এই প্রবণতা আটকানোর চেষ্টা করেনি। কেউ বলেনি যে, চা শ্রমিকের রক্ত-ঘামে উপার্জিত লভ্যাংশ উত্তরবঙ্গেই বিনিয়োগ করতে হবে। বাম জমানা তো বটেই, তণমূল আমলেও সরকারি এবং অন্যান্য বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মচারীদের পাশাপাশি অধ্যাপক, শিক্ষকমণ্ডলী, আমলাদের বেতন কয়েকগুণ বেড়েছে। বেতনবৃদ্ধির হার নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু এঁরা অনটনে আছেন বলার উপায় নেই। চা শ্রমিকরা যে নিদারুণ আর্থিক সংকটে রয়েছেন, তা সরকারি পরিসংখ্যানই জানান দেয়। ১৯৬৮ সালের ১ এপ্রিল উত্তরবঙ্গের চা শ্রমিকরা মজুরি পেতেন ২ টাকা ২৬ পয়সা। ইন্ডিয়ান টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য অনুসারে ২০১০ সালে এই মজুরির পরিমাণ ছিল ৬৭ টাকা। ২০১০ সালের ১ এপ্রিল চা শ্রমিকদের মজুরি বেড়ে হয় ৮৫ টাকা। বর্তমানে চা শ্রমিকরা মজুরি পাচ্ছেন দৈনিক ১৭৬ টাকা। ৫২ বছরে তাঁদের মজুরি বেড়েছে ১৭৩ টাকা ৭৪ পয়সা। ইতিমধ্যে টাকার মূল্য হ্রাস পেয়েছে। আনুপাতিক হারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। অথচ উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির প্রাণভোমরা চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটেনি। কেউ বোঝারই চেষ্টা করেনি যে, এটা না করলে উত্তরবঙ্গের সার্বিক অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটবে না। মজুরি চুক্তি আবার কবে হবে, জানেন না চা শ্রমিকরা। বাজারমূল্যের নিরিখে মজুরি দিতে মালিকপক্ষের অনীহার শেষ নেই।

চা শিল্পের আধুনিকীকরণে নতুন বিনিযোগ না করায় বৃহত্ শিল্পগোষ্ঠীর মালিকানাধীন অনেক চা বাগানের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। হাজার হাজার চা শ্রমিক অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন উত্তরবঙ্গকে সুইৎজারল্যান্ডের মতো মোহময় করে তুলবেন। পর্যটকরা আসবেন। দার্জিলিং পশ্চিমবঙ্গের ভূস্বর্গ। নিশ্চিতভাবে দার্জিলিংয়ে মোহময় পরিবেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের অন্যত্র পর্যটকদের দ্রুত পৌঁছে যাওয়ার পরিকাঠামো আজও তৈরি হয়নি। আজও এখানকার রাস্তা খানাখন্দে ভরা। বর্ষায় গাড়িচালকদের ঈশ্বরের নাম জপ করে গাড়ি চালাতে হয়। বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়ন সম্পর্কিত ইশ্যুতে কলম ধরার পরামর্শ কিন্তু এখনও প্রাসঙ্গিক। উত্তরবঙ্গে পর্যটক আসেন না, তা নয়। তবে পরিকাঠামো সুন্দর ও আরও শোভন হলে নিশ্চিতভাবে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। বুদ্ধবাবুর উত্তরসূরি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও চা পর্যটনে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তব হল, তাঁর আমলেও চা পর্যটনের বিকাশ তেমনভাবে হয়নি। আলিপুরদুয়ার জেলায় ফাঁসখাওয়া চা বাগান কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে পর্যটনের ব্যবস্থা করেছে। বিশিষ্ট শিল্পপতি কৃষ্ণকুমার কল্যাণী সরস্বতীপুর চা বাগানে এই ধরনের পর্যটন প্রকল্প তৈরি করেছেন। এর বাইরে সার্বিকভাবে কিছু হয়নি। অথচ চা পর্যটনে উন্নতি হলে উত্তরবঙ্গে কর্মসংস্থানের অনেক সুযোগ সৃষ্টি হত।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন টি টুরিজম বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে চা শিল্পপতিদের সঙ্গে বিন্নাগুড়ির সেন্ট্রাল ডুয়ার্স ক্লাবে সভা করেছিলেন। সেসময় কথা প্রসঙ্গে বুদ্ধবাবু বলেছিলেন, চা পর্যটন উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির ছবি বদলে দেবে। কিন্তু বাস্তবে কোনও বদল হয়নি। চা বাগানের জমি অন্য কাজে ব্যবহার করতে গেলে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের বিশেষ ছাড়পত্র দরকার হয়। যে জমিতে পর্যটন প্রকল্প গড়ে তোলা হবে, নিয়মানুযায়ী চা বাগান মালিককে তা সারেন্ডার করতে হবে ভূমি দপ্তরে। ভূমি দপ্তর ছাড়পত্র দিলে তবে পর্যটন প্রকল্প হবে। দীর্ঘসূত্রিতার জেরে সেই প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছিল বুদ্ধবাবুর জমানাতেই। সরকারি একটি উদাহরণ তুলে ধরা যাক। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাহায্যপ্রাপ্ত হিলা চা বাগানে পর্যটনকেন্দ্র গড়তে বামফ্রন্ট সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। হিলা চা বাগানের তৎকালীন ম্যানেজার রামঅবতার শর্মা সরকারি আধিকারিকদের প্রস্তাবিত জমি দেখিয়েছিলেন। কিন্তু হিলা চা বাগানে পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের জন্য একটি ইটও গাঁথা হয়নি এরপর। তাছাড়া অনেক মালিকই চা বাগানের জমির মালিকানা এভাবে ফিরিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না। ফলে তাঁরা টি টুরিজমে তেমন আগ্রহও দেখাননি। সেই মালিকদের বাধ্য করার উদ্যোগও সরকারের কখনও ছিল না। এখনও নেই। অথচ উত্তরবঙ্গের চা বাগানে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমি পতিত অবস্থায় রয়েছে। চা বাগান কর্তৃপক্ষ এই জমি ব্যবহার করেন না। নির্দ্বিধায় এই পরিত্যক্ত জমি ব্যবহার করে চা বাগানের শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য স্বনির্ভর প্রকল্প তৈরি করা যায়।

যায় তো। কিন্তু কে নেবে এই উদ্যোগ। আগেও কেউ উদ্যোগ নেয়নি, এখনও নেয় না। দেবাদিত্য চক্রবর্তী জলপাইগুড়ির বিভাগীয় কমিশনার পদে থাকাকালীন চা বাগানের এই ৪০ হাজার হেক্টর পতিত জমির প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। কিন্তু তাতে জট খোলেনি। চা বাগানের মালিকদের একটি বড় অংশ চা শ্রমিকদের কাছ থেকে পিএফ খাতে টাকা কেটে নিলেও সরকারি কোষাগারে জমা দেন না। উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিতে বকেয়া পিএফের পরিমাণ কম নয়। ২০০ কোটি টাকা। বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উন্নয়নের জন্য কলম ধরতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাস্তবে কলমের পরামর্শ কলমেই থেকে গিয়েছে তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বেও।