শুভজিৎ দত্ত, নাগরাকাটা : অসমের চা বাগানে তো ছিলই। ডুয়ার্সের চা বাগানেও একসময়ে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা টি টোকেনের প্রচলন ছিল। বহু বাগান বর্তমানে অনলাইনে মজুরি প্রদানের রাস্তায় হাঁটছে। টি টোকেন ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চা বাগানগুলিতে নগদে মজুরি দেওয়ার পরিবর্তে শ্রমিকদের টোকেন দেওয়া হত। শ্রমিকরা সেই টোকেন নিয়ে কাছাকাছি হাটে কেনাকাটা করতে পারতেন। বিক্রেতারা পরে সেই টোকেন বাগানে জমা দিয়ে নগদে অর্থ নিয়ে যেতেন। এ বিষয়ে ধুবড়ির গবেষক শংকরকুমার বসুর ব্রিটিশ মুদ্রা ব্যবস্থায় চা বাগানের পয়সা নামে একটি বইও রয়েছে। যার মুখবন্ধ লিখেছেন উত্তরবঙ্গের ইতিহাসবিদ ডঃ আনন্দগোপাল ঘোষ। অসমের চা বাগানে ধাতুর মুদ্রা প্রচলিত ছিল। তাতে খোদাই করা থাকত বাগানের নাম। ডুয়ার্সের বাগানে অবশ্য ধাতু নয়। কাঠবোর্ডের টোকেন প্রচলিত ছিল। ডুয়ার্সের বানারহাটের কারবালা বাগানে প্রথম এই টোকেন চালু হয়। গবেষকরা জানাচ্ছেন, সেখানে ১৮৯৪ সালে এক আনার টোকেন প্রথম চালু করা হয়। যেটির বৈধতা ১৯৪৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকবে বলে টোকেনে লেখা ছিল। শেষ টোকেন দেওয়া হয় স্বাধীনতার পরে।  মেয়াদ ছিল ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিটি টোকেনের গায়ে ম্যানেজারের স্বাক্ষরের জায়গা সহ আলাদা সিরিয়াল নম্বর খোদাই করা থাকত। বাগানে ওই ধরনের টোকেন চালুর নেপথ্যে যে কারণগুলির কথা উঠে আসে তার মধ্যে অন্যতম হল মুদ্রার ঘাটতি। আনন্দগোপাল ঘোষ বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে অ্যালুমিনিয়াম, তামার মতো ধাতুর ব্যবহার বেড়ে যায়। ফলে সেগুলি দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে। সম্ভবত সেকারণেই ধাতুর খুচরো পয়সার আকাল মেটাতেই বাগানগুলি নিজেরাই টোকেন ব্যবস্থা চালু করে। উত্তরবঙ্গের চা বাগান বিশেষজ্ঞ রামঅবতার শর্মা বলেন, আমি নিজের চোখেই হিলা ও ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগানের মুদ্রা দেখেছি। স্বাধীনতার পরও কিছুদিন এটা প্রচলিত থাকলেও এখন অবশ্য সে সব কোথাও নেই। তবে এটা নিয়ে আরও গবেষণা হলে ভালো হয়। কোচবিহারের ঋষি পাল নামে এক গবেষক বলেন, যখন এই ধরনের টি টোকেন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তখন প্রত্যন্ত এলাকার বাগানে কলকাতা থেকে নিয়মিত টাকা নিয়ে যাওয়াটা প্রায় অসম্ভব ছিল। বাগানগুলির ওই ইতিহাস কিন্তু সেভাবে সংরক্ষিত নেই। কারবালা চা বাগানের ম্যানেজার স্মরজিৎ সিংহবাবু বলেন, আমাদের বাগান এরকম একটি ইতিহাসের সঙ্গে য়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তা জানতামই না। দ্রুত পুরোনো নথিপত্র খুঁজে আরও কিছু যদি জানা য়ায় তা বের করার চেষ্টা করব।