টি টুরিজমে দিশা দেখাচ্ছেন উত্তরের ক্ষুদ্র চা চাষিরা

324

নাগরাকাটা : বড় বাগানে নয়া আঙ্গিকের টি ট্যুরিজমের সরকারি প্রস্তাব নিয়ে চায়ের পেয়ালায় তর্কবিতর্কের তুফান এখন অন্তহীন। এ ব্যাপারে কোনো সরকারি নির্দেশিকা বের হয়নি। তবে রাজ্য ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্তের কথা চাউর হতেই জমি ইশ্যুতে নিজেদের তীব্র আপত্তির কথা আগাম জানিযে রেখেছে একাধিক চা শ্রমিক সংগঠন। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গের একাধিক স্থানে কিন্তু দিশা দেখাতে শুরু করেছে ক্ষুদ্র চা চাষিদের নিজেদের বাগানে একক উদ্যোগে গড়ে ওঠা হোম স্টে ট্যুরিজম। ওই চাষিরা বলছেন, এর ফলে বাড়তি আয়ের পথ যেমন প্রশস্ত হয়েছে, তেমনই এলাকায় কিছু কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। ক্ষুদ্র চা চাষিদের সর্বভারতীয় সংগঠন সিস্টা-র সভাপতি ও জলপাইগুড়ি জেলা ক্ষুদ্র চা চাষি সমিতির সম্পাদক বিজয়গোপাল চক্রবর্তী বলেন, ‘ক্ষুদ্র চাষিদের বাগানে হোম স্টে ট্যুরিজমের সম্ভাবনা যে অপার সেকথা আমরা এর আগেই প্রশাসনকে জানিয়েছি। প্রায়  নীরবে একাধিক ক্ষুদ্র বাগানে ওই পর্যটন শুধু গড়ে উঠেনি, তা বেশ ভালোই চলছে। সরকারি সাহায্য পেলে বিষয়টি যে আরও বিস্তার লাভ করবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রেই জানা গেছে ক্ষুদ্র বাগানে হোম স্টে গড়ে তুলতে একমাত্র কিছু পুঁজি ছাড়া আর কোনো সমস্যা নেই। বড় বাগানের মতো জমি সংক্রান্ত আইনি ম্যারপাঁচের কবলেও এখানে পড়তে হয় না। হোম স্টে-র জন্য বিশাল পরিমাণ জমিরও প্রয়োজন নেই। অথচ পর্যটকদের যেটা মূল চাহিদা চা বাগানের মধ্যেই নিরিবিলিতে দু-দণ্ড কাটিযে যাওয়া তা পূরণ হয় নির্ভেজালভাবেই। তবে ফ্যাক্টরি না থাকায় চা তৈরি করার কলাকৌশল সেখানে দেখা সম্ভব হয় না। তবে যে চা চাষিরা হোম স্টে তৈরি করেছেন তাঁরা আশপাশের বড় বাগানের বা স্বনির্ভর গোষ্ঠী পরিচালিত চা ফ্যাক্টরিতে নিযে গিয়ে ভ্রমণপিপাসুদের সেই ইচ্ছেও অপূর্ণ রাখছেন না।

- Advertisement -

জলপাইগুড়িতে ক্ষুদ্র চাষীদের বাগানে এখন পুরোদস্তুর হোম স্টে রয়েছে লাটাগুড়ির ডাঙ্গাপাড়ায়। প্রতাপ তামাং নামে এক চাষি গত ৪ বছর ধরে তাঁর বাগানে ওই হোম স্টে বেশ ভালোমতোই চলছে। তাঁকে দেখে এখন ওই গ্রামেই নিজের বাগানে হোম স্টে গড়ছেন রামবাহাদুর সুব্বা নামে আরেক চা চাষি। পাশের সরস্বতীপুর ও বিচাভাঙ্গা বনবস্তিতেও বাগান লাগোয়া এলাকায় আরও দুটি নতুন হোম স্টে তৈরি হচ্ছে।

এটা যদি হয গরুমারা লাগোয়া লাটাগুড়ির ক্ষুদ্র চাষিদের কাহিনি তবে জঙ্গল এলাকার বাইরেও এর উদাহরণ রয়েছে। তরাইয়ের ফাঁসিদেওযার ফুলবাড়ি, পাহাড়ের মিরিক, বিজনবাড়ি কিংবা গরুবাথানের নিমবস্তি এলাকার ক্ষুদ্র বাগানগুলিতে গড়ে উঠেছে একাধিক হোম স্টে। পাহাড়ের ওই সব হোম স্টে-তে বিদেশি পর্যটকদেরও আনাগোনা। মকাইবাড়ি চা বাগানের হোম স্টের সুখ্যাতিও রয়েছে। জলপাইগুড়ির মোহিতনগরে সুশোভন সরকার নামে এক ক্ষুদ্র চাষি তাঁর বাগানে হোম স্টে না গড়লেও বিনোদনের জন্য একটি রেস্তোরাঁ তৈরি করেছেন। সেখানেও অনেকেই ঢুঁ মারছেন প্রকৃতির মাঝে কিছুক্ষণ কাটিয়ে তরতাজা হতে।
লাটাগুড়ির হোম স্টে-র কর্ণধার প্রতাপ তামাং বলেন, ‘চা বাগান থাকায় এই ধরনের হোম স্টে-র প্রতি পর্যটকদের দারুণ আকর্ষণ রয়েছে। সম্ভাবনা দেখে অন্য ক্ষুদ্র চা চাষিরাও এখন এগিযে আসছেন। সরকারি সহায়তা পেলে বিষযটি যে অন্য মাত্রায় পৌঁছে যাবে তা অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।’ লাটাগুড়ি স্মল টি গ্রোয়ার্স সোসাইটির মুখ্য উপদেষ্টা প্রাণতোষ কর বলেন, ‘এখানকার ২০০ চাষির মধ্যে অনেকের বাগানের সৌন্দর্যের তুলনা নেই। হোম স্টে-র মাধ্যমে ওই সব বাগানে বিকল্প রোজগার ছাড়াও স্থানীযদের কর্মসংস্থানেরও পথ প্রশস্ত হতে পারে।’

ছবি : লাটাগুড়ির এক ক্ষুদ্র চাষির বাগানে হোম স্টে।

তথ্য ও ছবি : শুভজিৎ দত্ত