সৌরভ দেব, জলপাইগুড়িঃ অনিতবাবুর ৩৭ বছরের শিক্ষকতার চাকরি শনিবারই ছিল শেষ দিন। এদিন অবসর নেওয়ার পর প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র্যাচুইটির পুরো টাকাই দিয়ে গেলেন ছাত্রদের খেলাধুলো এবং দুস্থ ছাত্রদের পড়াশোনার জন্য। চাকরি জীবনের শেষদিনে ছাত্রদের এমন উপহার দিয়ে দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন জলপাইগুড়ির তোড়লপাড়ার নেতাজি বিদ্যাপীঠের ফিজিক্যাল এডুকেশনের শিক্ষক অনিতকুমার ঘোষ। এদিন তাঁর অবসরগ্রহণের অনুষ্ঠান স্কুল প্রাঙ্গণে রীতিমতো উত্সবের চেহারা নিয়েছিল।

শিক্ষক দিবসের এখনও বাকি চারদিন। কিন্তু অনিতবাবুর অবসরগ্রহণের অনুষ্ঠানে এদিন নেতাজি বিদ্যাপীঠে তৈরি হয়ে যায় শিক্ষক দিবসের পরিবেশ। অনুষ্ঠানের তোড়জোড় শুরু হয়েছিল বেশ কয়েদিন আগে থেকেই। আগেই ঠিক হয়েছিল এদিন স্কুলের সমস্ত শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীদের খাওয়াবেন অনিতবাবু। মেনুতে ছিল ফ্রায়েড রাইস, মাংস এবং মিষ্টি। খেলার মাঠের শিক্ষক বলেই পরিচিত ছিলেন অনিতবাবু। নিজের স্কুলের ছাত্ররাই নন আশপাশের এলাকার ছেলেমেয়েদেরকেও নিয়মিত উত্সাহ দিতেন খেলাধুলোর জন্য। অনিতবাবুর হাতে তৈরি হয়েছেন জেলার অনেক কৃতী খেলোয়াড়। চাকরি জীবনে খেলাধুলোর সরঞ্জাম থেকে শুরু করে পড়াশোনার জন্য বইখাতা নিযমিত কিনে দিয়ে আসতেন দুস্থ মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের। অবসরগ্রহণের পরেও একই কাজ করে যেতে চান অনিতবাবু। আর যে কারণে অবসরগ্রহণের দিন কর্মস্থল থেকে যেমন উপহার নিলেন, তেমনি উপহার উজাড় করে দিয়ে গেলেন প্রিয় ছাত্রদের এবং স্কুলকে। এদিন বিদ্যালয়ে ছাত্র থেকে শুরু করে শিক্ষক এমনকি প্রাক্তন ছাত্রদের নিয়ে খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে ৮০ জনকে নিজের এবং বিদ্যালয়ে বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি প্রিণ্ট করা একটি করে চায়ের কাপ উপহার দিয়েছেন তিনি। এছাড়াও ৬ জন দুস্থ ছাত্রকে ১ হাজার টাকা করে মোট ছয় হাজার টাকা উপহার দিয়েছেন। এছাড়া জেলার বিভিন্নস্তরের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায সফল হওয়া ৬ জন ছাত্রকে ১ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। এছাড়াও দুজন ছাত্রকে ৩ হাজার এবং আরও দুই ছাত্রকে ৫ হাজার টাকা করে দিয়েঠেন তিনি। এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায স্কুলের সব থেকে বেশি নম্বর পাওয়া ছাত্রকে ২০ হাজার এবং এক প্রাক্তন ছাত্রকে ২৫ হাজার টাকা দিয়েঠেন অনিতবাবু। চাকরি জীবনে অনিতবাবুর জীবনে এসেছিল লিটন রায়। ছোটোবেলা থেকেই অনিতবাবুর বাড়িতেই থাকতেন লিটন। কলেজ জীবন শেষ করে এখন লিটন একজন সিভিক ভলান্টিয়ার। এখনও থাকেন অনিতবাবুর সঙ্গেই। লিটনের নামে সাড়ে চার লক্ষ টাকার বিমা (এমআইএস) করে দিয়েছেন। কেবল এই সাড়ে চার লক্ষ টাকাই নয, তোড়লপাড়ার বাড়িটিও লিটনকে দেবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। এখানেই শেষ নয়, স্কুলের খেলার মাঠে তিনি একটি ক্যাম্প চালিয়ে আসছেন ছাত্রদের নিয়ে, তার জন্য এক লক্ষ টাকা এমআইএস করেছেন। এছাড়াও স্কুলের দুস্থ মেধাবী ছাত্রদের বইখাতা কেনার যাতে কোনো অসুবিধে না হয তার জন্য আরও এক লক্ষ টাকা এমআইএস করে দিয়েছেন তিনি।

অনিতবাবু তাঁর চাকরি জীবনের শেষে প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র‌্যাচুইটি থেকে প্রায ৯ লক্ষ টাকা পাচ্ছেন। যার পুরোটাই তিনি এদিন তার প্রিয ছাত্রছাত্রী এবং স্কুলকে দিয়ে গেলেন। লিটন রায় বলেন, ‘আমি ছোটোবেলা থেকেই স্যারের সঙ্গে রয়েছি। তিনি আমার অভিভাবক। একজন শিক্ষক তার ছাত্রছাত্রীদের কতটা ভালোবাসেন তার উদাহরণ অনিত স্যার।’ স্কুলের প্রধান শিক্ষক শেখর দাস বলেন, ‘অনিতবাবু প্রশংসার ঊর্ধ্বে। তাঁর প্রশংসা যতটাই করা হবে আমার মনে হয কম থেকে যাবে। সমস্ত শিক্ষকদের কাছে একটা শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরে গেলেন জলপাইগুড়িতে। আমরা অভিভূত এবং স্কুলের ক্রীড়াক্ষেত্রে অনিতবাবু একটা অবদান রেখে গেলেন।’ শেখরবাবু আরও বলেন, ‘আমরা তাঁকে প্রস্তাব দিয়েছি, খাতায় কলমে অবসর নিলেও তিনি যেন স্কুলের খেলাধূলার বিষয়টি দেখেন।’ অনিতবাবু বলেন, ‘আমার কর্মজীবন কেটেছে ছাত্র আর খেলার মাঠ নিয়ে। যেটুকু পেনশন পাব তা দিয়ে আমার বাকি জীবন চলে যাবে। তাই এই টাকা আমি ছাত্রদের খেলা এবং পড়াশোনার জন্য দিয়ে গেলাম। আর আমার পরিবার বলতে লিটন। তাই ওর ভবিষ্যতের কথা ভেবেও কিছু টাকা দিয়ে গেলাম। সেই সঙ্গে আমার এই বাড়িটিও আমার পারে লিটনের থাকবে এই ব্যবস্থাও করে দেব আমি।’