প্রতীকী চিত্র

কল্লোল মজুমদার, মালদা : জেলার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একের পর এক ঘটে চলেছে অবাঞ্ছিত ঘটনা। কখনো মোবাইলে ছাত্রীদের ছবি তুলে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা, আবার কখনো বা তাদের শ্লীলতাহানি করার মতো ঘটে চলেছে। তার ওপর আবার সরকারি নির্দেশিকার ফলে পড়ুয়াদের শাসন করতে গেলেও দেখা দিচ্ছে বিপত্তি। রীতিমতো আন্দোলন শুরু হয়ে যাচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে। স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত শিক্ষকমহল। একদিকে সরকারি নিয়ম আর অন্যদিকে অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীদের একাংশের চোখরাঙানিতে ক্লাস নিতে ভয় পাচ্ছেন অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা। আতঙ্কের এই পরিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিকভাবেই সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছেন অনেকে।

রায়গঞ্জে উদ্ধত এক ছাত্রকে শাসন করতে গিয়ে ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল প্রধান শিক্ষককে। শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিগ্রহের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছিল ওই ছাত্রই। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শিক্ষকরা পড়ুয়াদের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন। এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার দায়ে অভিযুক্ত ছাত্রকে শাসন করায় বাকি ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে। পরিস্থিতি এতটাই  উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে স্কুলে যেতে হয় মোথাবাড়ি থানার পুলিশকে। একের পর এক শিক্ষক আক্রান্ত হওযার জেরে আতঙ্ক ছড়িয়েছে শিক্ষকমহলে। অভিজ্ঞান সেনগুপ্ত নামে এক শিক্ষক বলেন, আমরা এক নৈরাজ্যের মধ্যে বাস করছি। শিক্ষক-শিক্ষিকারা যেন এলাকার মানুষদের লক্ষ্যবস্তু। সামান্যতম ত্রুটিবিচ্যূতি দেখলেই তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়ছেন শিক্ষকদের ওপর। শিক্ষকদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারলেই যেন স্কুলের যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। যাবতীয় অন্যায় আবদার মানতে বাধ্য করা হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। শিক্ষার অধিকার আইন সমস্তরকম শাস্তি নিষিদ্ধ করেছে। অথচ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছাত্রছাত্রীদের চিন্তাভাবনা, কাজকর্মের যে সব আমূল পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, আত্মকেন্দ্রিক, বেপরোয়া সাম্প্রদায়িক করে তুলছে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো উপায় আইনে রাখা হয়নি। শিক্ষক-শিক্ষিকারা তাই ঢাল তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার। সামান্য কিছু শিক্ষকের ভুলের কারণে যখন সমস্ত শিক্ষকসমাজকে দোষী বলে দাগিয়ে দেওযা হয়, তাতে এলাকার মানুষের কাছে তারা প্রতিদিন সামাজিক শত্রুতে পরিণত হচ্ছেন। বাঙ্গীটোলা হাইস্কুলের শিক্ষিকা ঋতুপর্ণা সাহা বলেন, এখন শিক্ষকরা বিভিন্ন নিয়মের কারণে অসহায় বোধ করছেন। আমরা ছাত্রছাত্রীদের শৃঙ্খলায় বেঁধে রাখতে পারছি না। অথচ সামান্য ত্রুটি হলেই ছাত্র, অভিভাবক, এলাকার রাজনৈতিক মানুষ স্কুলে আক্রমণ করছেন। শিক্ষক-শিক্ষিকারাও নিরাপদ বোধ করছেন না। ফলে তাঁরাও যা হচ্ছে হোক, এই মনোভাব পোষণ করছেন। এতে স্কুলের পরিবেশ খারাপ হচ্ছে। সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তন প্রযোজন।

সাট্টারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক অভিজিত্ চক্রবর্তী বলেন, শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী কর্পোরাল পানিশমেন্ট বন্ধ। এর দুটো দিক খুব স্পষ্ট। ছাত্রদের অন্যায়ে বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। অপরদিকে হাজার ভুল করা সত্ত্বেও শিক্ষকরা শাস্তি দিতে পারেন না। ফলে ছাত্রদের অনেকেই অপরাধ করে ধরা পড়ার পরেও কোনোরকম অপরাধ বোধে ভোগে না। আজ শিক্ষকদের হাত-পা বাঁধা। ছাত্রীদের ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। অভিভাবকরা পাছে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে, সেই ভয়ে চুপচাপ থেকে চাকরি করাই শ্রেয় বলে মনে করছেন অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা।