মেডিকেল সার্টিফিকেট পেতে রাতভর লাইনে শিক্ষক-শিক্ষিকারা

618

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : স্বাস্থ্য পরীক্ষার সার্টিফিকেট পেতে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে খোলা আকাশের নীচে সারারাত লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে বিভিন্ন জেলার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। হয়রানি বন্ধে পদক্ষেপ করেনি শিক্ষা দপ্তর। হেলদোল নেই স্বাস্থ্য দপ্তরেরও। সপ্তাহে মাত্র তিনদিনই (সোম, মঙ্গল ও বুধবার) নির্দিষ্ট সংখ্যক আবেদনকারীকে সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে। সুযোগ বুঝে সার্টিফিকেট পাইয়ে দেওয়ার নামে সক্রিয় হয়েছে দালালচক্র। একদিনেই মোটা টাকার বিনিময়ে টেস্টের রিপোর্টও এনে দিচ্ছে তারা। হয়রানির জেরে ব্যাপক ক্ষুব্ধ শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

উত্তরের আট জেলার শিক্ষকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। ফলে কোচবিহার থেকে মালদা সব জেলার শিক্ষকদেরই আসতে হচ্ছে শিলিগুড়িতে। ২০১৭ সালের পর যাঁরা স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার শংসাপত্র জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশিকা জারি করেছে শিক্ষা দপ্তর। সেইমতো তালিকাও প্রকাশিত হয়েছে। তারপরই স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

- Advertisement -

মেডিকেল কলেজের নির্দেশিকা অনুসারে প্রত্যেক শিক্ষক-শিক্ষিকাকে চোখ, নাক-কান-গলা, কার্ডিওলজি, সার্জারি বিভাগে গিয়ে একাধিক পরীক্ষা ছাড়াও এক্সরে, ইসিজি, রক্ত ও প্রস্রাবের বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। তারপর তার রিপোর্ট নিয়ে মেডিকেল বোর্ডের কাছে জমা দিতে হচ্ছে। বোর্ড সেইসব রিপোর্ট খতিয়ে দেখে তবেই শংসাপত্র দিচ্ছে। এইসব প্রক্রিয়া শেষ করতেই দুই থেকে তিনদিন লেগে যাচ্ছে। যেহেতু মাত্র তিনদিন সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে তাই মালদা, উত্তর বা দক্ষিণ দিনাজপুরের মতো দূরবর্তী জেলাগুলি থেকে যেসব শিক্ষক-শিক্ষিকারা আসছেন তাঁদের সার্টিফিকেট পেতে এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গের স্কুলে চাকরি করেন অথচ বাড়ি দক্ষিণবঙ্গে, সেইসব শিক্ষক-শিক্ষিকারা আরও বেশি সমস্যায় পড়েছেন। স্কুল বন্ধ থাকায় তাঁরা বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। সার্টিফিকেটের জন্য তাঁদেরও শিলিগুড়িতে এসে পড়ে থাকতে হচ্ছে।

নিয়ম অনুসারে মেডিকেল কলেজেই বিনা পয়সায় শিক্ষকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার কথা। এমনিতেই বিভিন্ন বিভাগে গিয়ে টিকিট কেটে চিকিৎসককে দেখাতে দু-তিনদিন সময় লেগে যাচ্ছে। তার উপর মেডিকেলে পরীক্ষার ভরসায় থাকলে রিপোর্ট পেতে আরও বেশি সময় লাগাটাই স্বাভাবিক। তাই বাইরের অনুমোদিত ল্যাব থেকে নির্ধারিত পরীক্ষা করিয়ে এনে তার রিপোর্ট দিলেও তার ভিত্তিতে সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একাংশের অভিযোগ, মেডিকেল কলেজে গড়ে ওঠা দালালচক্র তিন থেকে চার হাজার টাকার নিয়ে একদিনেই সমস্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট এনে দিচ্ছে। সময় ও হয়রানি এড়াতে অনেকেই সেই চক্রে ফাঁদে পা দিচ্ছেন।

মঙ্গলবার রাত ১টায় মেডিকেলের সুপারের দপ্তরের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন দক্ষিণ দিনাজপুরের এক শিক্ষিকা। বললেন, চাকরি বাঁচাতে হবে। তাই কোনও উপায় নেই। এখন লাইন না দিলে কাল সার্টিফিকেট পাব না। তাহলে আবার এক সপ্তাহ থাকতে হবে। চরম হয়রানি সত্ত্বেও সবকিছুকে উপেক্ষা করে লাইনে দাঁড়িয়েছি। মালদার এক শিক্ষক বলেন, সোমবার রাত তিনটের সময় লাইনে দাঁড়িয়ে সার্টিফিকেট পাইনি। তাই আরও আগে এসেছি। শিক্ষা দপ্তর চাইলেই এই হয়রানি এড়ানো যেত। আট জেলার দায়িত্ব একটি মেডিকেল কলেজকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

শিক্ষা দপ্তরের কোনও আধিকারিক বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে চাইছেন না। একাধিকবার চেষ্টা করলেও দপ্তরের মন্ত্রী ফোন ধরেননি। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার সঞ্জয় মল্লিকের বক্তব্য, কোভিডের জন্য আমাদের কাজের চাপ এমনিতেই কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। তাই প্রতিদিন সার্টিফিকেট দেওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। যাঁরা আসছেন তাঁদের সবাইকেই সার্টিফিকেট দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। কেন শুধুমাত্র একটি মেডিকেল কলেজের উপর আট জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটা বুঝতে পারছি না। জেলা হাসপাতালেই  তো এই কাজ হয়ে যেত। সেটা হলে শিক্ষকদেরও হয়রানি কমে যেত। স্কুল শিক্ষা দপ্তরের বিষয়টি ভাবা উচিত। তবে দালালচক্রের অভিযোগ মানতে চাননি তিনি।