শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি : সূর্য ওঠার সঙ্গে কনডাক্টরদের হাঁকডাকে জেগে ওঠে তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাস। কিন্তু তারও অনেক আগে থেকেই দিন শুরু হয় আরতির। গুরুংবস্তির বাসিন্দা বছর সতেরোর আরতির টার্গেট, সে পুলিশ অফিসার হবে। সেই লক্ষ্যে ওর লড়াইও শুরু হয় খুব ভোরে, বাস টার্মিনাস থেকে বেরোনোর মুখে এককোণে বসে খবরের কাগজ বিক্রি দিয়ে সংসার চালাতে মায়ের পাশে দাঁড়ানোর তার এই লড়াইয়ে বাধা আসে প্রায়ই।  শুনতে হয় নানা কটূক্তিও। কিন্তু সংসারে মাকে ভালো রাখার জন্য সেসব গায়ে মাখে না রাজেন্দ্রপ্রসাদ গার্লস হাইস্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী আরতি শাহ। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-পুজোপার্বণ কিছুই তাকে লক্ষ্য থেকে টলাতে পারে না।

দুমুঠো ভাত জোগাড় করতে আরতি ও তার মা গীতা শাহর এই যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পনেরো বছর আগেকার এক রাত। সেই রাতে হঠাত্ করে আরতির বাবা সীতারাম শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। বাস টার্মিনাসে ঘুরে ঘুরে খবরের কাগজ বিক্রি করলেও এলাকার পরিবেশের কথা মাথায় রেখে সীতারাম কোনোদিনই চাননি তাঁর স্ত্রী এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সংসার চালাতে গীতাদেবী খবরের কাগজ বিক্রিকেই পেশা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এই পেশাতে এক আনকোরা মহিলাকে বিশ্বাস করা যে খুব কঠিন। তবুও মনের জোরে এক এজেন্টকে রাজি করিয়ে শুরু হয় গীতাদেবীর লড়াই। ভোর চারটের সময়ে খবরের কাগজ নেওয়ার পাশাপাশি সকাল সাড়ে ছটা থেকে সাতটার মধ্যে মালিকের হাতে টাকা পৌঁছে দেওযার এই লড়াইয়ে মাত্র সাত বছর বয়সে মায়ে পাশে দাঁড়ায় আরতি। মায়ে সঙ্গে খবরের কাগজ নেওয়া, সাজানো এবং মালিকদের হাতে মা টাকা দিতে যাওয়ার পর টার্মিনাসের এককোনায় বসে সেই খবরের কাগজ বিক্রি দিয়ে শুরু হয় তার পথচলা। আরতির কথায়, মায়ের কষ্ট দূর করতে আমি রোজ ভোর থেকে এখানে বসি। খবরের কাগজ বিক্রি করতে না পারলে যে কিছু খেতে পাব না। দিনে  সবমিলিয়ে একশো থেকে দুশোটা খবরের কাগজ বিক্রি হয়। কিন্তু এরমধ্যে অনেকে এমনি খবরের কাগজ নিয়ে চলে যায়। টাকা চাইলে উলটে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। রোদ, বৃষ্টিতে ছাতা খুলতে গেলে কারও গায়ে সেই ছাতা লাগলেও রক্ষে নেই বলে অনুযোগ আরতির। মেয়ে এই গঞ্জনা সহ্য করতে না পেরে চোখের এককোণে গড়িয়ে পড়া জল মুছতে মুছতে গীতাদেবী বলেন, বড়ো ছেলে দেখে না। বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছোটো ছেলে মাসে দুই হাজার টাকা দিয়ে দায় সারে। ছোটো মেয়ে আরতিই যে আমার ভরসা। ওর শরীর খারাপ থাকলেও যে ওকে আসতে হয়, নইলে বাড়িতে ভাত ফুটবে না।

ডাঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সঞ্চিতা দেব বলেন, প্রতিকূল পরিবেশে আরতি ও তার মায়ে এই লড়াই আমাদের অনুপ্রাণিত করে।এই কষ্ট নিয়ে গত বছর আরতি ভালো নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পাস করেছে। আরতি যাতে তার লক্ষ্যে পেঁছায় তার জন্য আমরা সব সময়ে ওর পাশে থাকার চেষ্টা করছি।