হলদিবাড়ি : এখানে এলে ইতিহাস যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। যদিও আজও তার অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। কাশিয়াবাড়ির শতাব্দী প্রাচীন কালীবাড়িকে হেরিটেজ তকমা দিয়ে পাদপ্রদীপের তলায় নিয়ে আসার দাবি তাই ক্রমেই জোরাল হচ্ছে হলদিবাড়িতে।

কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ি ব্লকের উত্তর হলদিবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত কাশিয়াবাড়ি বাজার সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত এই মন্দির। ইট নির্মিত মন্দিরের ঘরটি ১০০ বছরের পুরোনো হলেও এই কালীমন্দিরকে কেন্দ্র করে তিনশো বছরের পুরোনো কাহিনি  প্রচলিত আছে।সকলেই বিশ্বাস করেন এই মন্দিরে দেবী চৌধুরানী ও ভবানী পাঠক পুজো করতেন। স্থানীয়দের দাবি অতীতে এই মন্দিরের ফলকে ১৩১৬ সাল লেখাটি স্পষ্ট ছিল। তা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের আমলে এই মন্দির তৈরি হয়েছিল। জানা যায়, রায় বাহাদুর সরযূপ্রসাদ সিং এই মন্দির তৈরি করে দিয়েছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন,  মন্দিরের প্রাচীন কাঠামো বা গঠনশৈলী এখনও রয়ে গিয়েছে। কখনও মন্দিরটি সংস্কার করা হয়নি। চুন সুরকি দিয়ে গাঁথা হয়েছিল ইট ও ছাদ। বহু প্রাকৃতিক দুর্যোগকে উপেক্ষা করে আজও অক্ষত রয়েছে মন্দিরটি। আজও প্রাচীন রীতি মেনেই পূজিত হন দেবী। সারাবছর মন্দিরে দেবীর মূর্তি থাকে না।পুজোর দিন দেবীর মূর্তি গড়ে পুজো দেওয়া হয়। ভোর হওয়ার আগেই পুজো শেষ হয়। পুজো  শেষে ভোরের আলো ফোটার আগেই মূর্তি বিসর্জন দেওয়া হয়। স্থাপনকাল থেকেই এখানে বলির প্রথা প্রচলন রয়েছে। যূপকাঠে যে খড়্গ দিয়ে পায়রা বা পাঁঠাবলি দেওয়া হয় সেই অস্ত্রটিও বহু প্রাচীন।

মাঝে তৎকালীন মন্ত্রী পরেশচন্দ্র অধিকারী, সাংসদ বিজয়চন্দ্র বর্মন, বর্তমান স্থানীয় বিধায়ক অর্ঘ্য রায়প্রধান ও বিডিও তাপস সিংহরায় মন্দির সংস্কারে তৎপরতা দেখালেও পরবর্তীতে সেই কাজ থমকে যায়। তিন পুরুষ ধরে মন্দিরের পুজোর দায়িত্ব সামলে আসছেন স্থানীয় প্রাক্তন লাইব্রেরির কর্মী তারিণীকান্ত রায়। তিনি বলেন, ‘হলদিবাড়ি ব্লকের প্রাচীন এই মন্দিরটির সঠিক গবেষণা ও সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। হেরিটেজ স্বীকৃতি পেলেই কোচবিহার জেলার ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এই ধর্মস্থানটি প্রচারের আলোয় আসতে পারে।’ কোচবিহার জেলা পরিষদের সদস্য গোপাল রায় বলেন, ‘কাশিয়াবাড়ির কালীমন্দিরটি ঐতিহ্যবাহী।এতো পুরোনো একটি ধর্মীয় স্থান হেরিটেজের তকমা দাবি করতেই পারে।’ হলদিবাড়ি হাই স্কুলের প্রাক্তন বিশিষ্ট শিক্ষক মৃণালকান্তি সরকার বলেন, ‘মন্দিরটির সঙ্গে এখানকার মানুষের আবেগ জড়িয়ে আছে।এখনও দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ এখানে পুজো দিতে আসেন। হেরিটেজ প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেলে খুব ভালো হয়।’

কোচবিহার হেরিটেজ সোসাইটির হলদিবাড়ি শাখা সম্পাদক নারায়ণচন্দ্র রায় বলেন, ‘হলদিবাড়ি যেহেতু কোচবিহার জেলায় অবস্থিত তাই মন্দিরটি দেবোত্তর ট্রাস্ট বোর্ডের আওতায় আনা ও সংস্কারের দাবি বহুবার প্রশাসনকে জানিয়েও ব্যর্থ হয়েছি।’ মেখলিগঞ্জের বিধায়ক অর্ঘ্য রায় প্রধান বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি যথাস্থানে দাবি জানাব। ইতিমধ্যেই ওই মন্দিরের যাবতীয় নথিপত্র জমা করতে বলেছি। এর উন্নয়নে কিছু পরিকল্পনা নেওয়ারও ইচ্ছে রয়েছে।’

ছবি- কাশিয়াবাড়ির কালীমন্দির।

তথ্য ও ছবি- অমিতকুমার রায়