চাঁদকুমার বড়াল, ছোটগুমা (ধুবড়ি) : ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক গ্রাস করেছে অসমের ধুবড়ি জেলার ছোটগুমা গ্রামের বাসিন্দাদের। শনিবার প্রকাশিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত তালিকাতেও যাঁদের নাম ওঠেনি, সেইসব পরিবারের মানুষের রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে। কখন কী হয়, এই ভয়ে দিন কাটছে তাঁদের। কীভাবে নিজেদের নাগরিক প্রমাণ করবেন, নাওয়া-খাওয়া ভুলে সেই চিন্তাই করছেন তাঁরা।

কোচবিহার জেলার বক্সিরহাটের কাছেই অসমের ধুবড়ি জেলার ছোটগুমা গ্রাম। এখানে বেশ কিছু পরিবারের সদস্যদের নাম নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত তালিকায় নেই। ছোটগুমায় গিয়ে দেখা গেল গ্রাম এখন আলোচনার বিষয় শুধু এনআরসি। গোটা এলাকায় থমথমে পরিবেশ। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিতেই তাঁরা নিজেদের সমস্যার কথা বলতে শুরু করলেন। এলাকার বাসিন্দা রেখা পণ্ডিত বলেন, আমার নাম তালিকায় আছে। কিন্তু আমার স্বামী ও দুই সন্তানের নাম নেই। কী করব বুঝতে পারছি না। বাড়িতে রান্না, খাওয়া সবই লাটে উঠেছে। শুধু চিন্তা করছি আমাদের কী হবে।

একইরকম সমস্যা আছে এলাকার আরও অনেকের। যেমন মহিরুন বিবি। তাঁর স্বামী ও ছেলের নাম থাকলেও তাঁর নাম নাগরিকপঞ্জিতে নেই। তিনি বলেন, শুনছি তালিকায় নাম না থাকলে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যাবে। কী করব, আমাকে ছাড়া সন্তান কীভাবে থাকবে বুঝতে পারছি না। ভয় করছে। আমার জন্ম পশ্চিমবঙ্গে। বিবাহসূত্রে এখন অসমে রয়েছি। চার হাজার টাকা খরচ করে কলকাতা থেকে পুরোনো কাগজপত্র আনিয়ে জমা দিয়েছিলাম। কিছুই হয়নি। এখন শুনছি ১২০ দিনের মধ্যে মামলা করতে হবে। আমরা সাধারণ মানুষ। মামলা করার মতো টাকা নেই। তাই হয়তো ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হবে শেষপর্যন্ত। এই ভয়ে রয়েছি। নাকি অন্য কিছু হবে কে জানে। আরেক বাসিন্দা আব্দুল করিম জানালেন, তাঁর পরিবারের ১৫ জন সদস্যের মধ্যে কারও নাম নাগরিকপঞ্জিতে নেই। কেন নেই. তার উত্তর কারও কাছে নেই। কী হবে বুঝতে পারছেন না আব্দুল।

মহিরুন বিবির মতো আশিরন বিবি, রেণুকা বিবিরা বিবাহসূত্রে অসমে থাকেন। বিয়ে আগে পশ্চিমবঙ্গে থাকতেন। তাই পরিবারের অন্য সদস্যের ১৯৬৬ সালের ভোটার লিস্টের কাগজপত্র জমা দিলেও তাতে কাজ হয়নি। নাম ওঠেনি নাগরিকপঞ্জিতে। কিন্তু তাঁদেরই মতো অনেক মহিলার আবার তালিকায় নাম উঠেছে। তাঁদের নাম কেন উঠল না তা বুঝতে পারছেন না। সমস্ত ব্যাপারটি গোলমেলে বলে তাঁরা মনে করছেন।

এই গ্রামের বেশ কিছু পরিবার আছে, যাদের সবার নাম তালিকায় নেই। যা নিয়ে তাঁরা এখানে-ওখানে ছোটাছুটি করছেন। কী হবে একে অপরকে প্রশ্ন করছেন। কিন্তু উত্তর তো সাধারণ মানুষের জানা নেই। সরকার নতুন কী ফরমান জারি করে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন সকলে। সরকারের আশ্বাসে ভরসা পাচ্ছেন না অনেকেই। বিদেশি বলে চিহ্নিত হওয়ার ভয় কুরে-কুরে খাচ্ছে তাঁদের।