মহানন্দা, তোর্ষা ও করলায় ভয়ংকর ব্যাকটিরিয়ার হদিস

264

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : শিলিগুড়িতে মহানন্দার জলে মিলল সমস্ত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন প্যান ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটিরিয়া। বিজ্ঞানের সহজ ভাষায় যাকে বলা হয় সুপার বাগ। প্যান ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটিরিয়াকে বিশ্বের ভয়ংকরতম ব্যাকটিরিয়া হিসাবেই চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। কোনওভাবে মানবদেহে ওই জাতীয় ব্যাকটিরিয়া ঢুকলে কোনও অ্যান্টিবায়োটিক দিযে সেটাকে মারা যাবে না। মহানন্দার জলে সেই ব্যাকটিরিয়া মেলায় হইচই পড়ে গিয়েছে সর্বত্র। চিন্তার ভাঁজ পড়েছে চিকিৎসক ও গবেষকদের কপালে।

মহানন্দা, তোর্ষা ও করলায় ভয়ংকর ব্যাকটিরিয়ার হদিস| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaমেরোপিনেমকে বলা হয় সবথেকে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক। অন্য কোনও অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করলে শেষ অস্ত্র হিসাবে মানবদেহে মেরোপিনেম প্রয়োগ করেন চিকিৎসকরা। ওই অ্যান্টিবায়োটিককে প্রতিরোধ করতে পারে এমন বেশ কয়েকটি ব্যাকটিরিয়ার নতুন প্রজাতি পাওয়া গিয়েছে জলপাইগুড়ির করলা নদীর জলে। একসঙ্গে অনেক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের শক্তি রয়েছে, এমন বহু ব্যাকটিরিয়া মিলেছে তোর্ষার জলেও। গবেষকরা জানিয়েছেন, উত্তরের এই তিন নদীতে কিলবিল করছে গোটা পৃথিবীর চিন্তার কারণ হযে দাঁড়ানো ভয়ংকর সব ব্যাকটিরিয়ার নতুন নতুন প্রজাতি। আর সেইসব নদীর জলই প্রতিদিন বিভিন্নভাবে ব্যবহার করছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনলজি বিভাগের অধ্যাপক রণধীর চক্রবর্তী এবং ওই বিভাগেরই একদল গবেষক দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যাকটিরিয়া নিয়ে কাজ করছেন। তাঁরাই মহানন্দার জলে ভয়ংকরতম ওই ব্যাকটিরিয়ার খোঁজ পেয়েছেন। রণধীরবাবু জানিয়েছেন, সিউডোমোনাস ব্যাকটিরিয়ার নতুন উপজাতি পিউটিডা (PUTIDA)-কে প্যান ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট হিসাবে চিহ্নিত করেছেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক জার্নালে সেই সংক্রান্ত ১৫টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, শুধু পিউটিডা নয়, মহানন্দার জলে ওই ধরনের আরও বেশ কিছু প্যান ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটিরিয়া আছে। সেগুলি চিহ্নিত করতে তাঁরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। করলা ও তোর্ষাতেও ছয়টি স্যাম্পলিং স্টেশন তৈরি করে কাজ হচ্ছে।  ক্ষতিকর বা রোগব্যাধি সৃষ্টিকারী ব্যাকটিরিয়া মেরে ফেলা বা তার কার্যকারিতা নষ্ট করার জন্য চিকিৎসকরা মানবদেহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেন।

একেক ধরনের ব্যাকটিরিয়া মারার জন্য একেক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বহু অ্যান্টিবায়োটিক আর মানবদেহে কাজ করছে না। কারণ জিন পরিবর্তন ও আদানপ্রদান করে ব্যাকটিরিয়াগুলি নতুন নতুন উপজাতি তৈরি করছে। ফলে সেগুলি অনেক বেশি শক্তিশালী হচ্ছে এবং অ্যান্টিবায়োটিককে প্রতিরোধ করার মতো ক্ষমতা তৈরি করে ফেলছে।

শুধু প্যান ড্রাগ নয়, একসঙ্গে ৭-৮ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করতে সক্ষম এমন অনেক ব্যাকটিরিয়ার নতুন উপজাতি পাওয়া গিয়েছে উত্তরবঙ্গের তিন নদীতেই। ভয়ংকর ওই ব্যাকটিরিয়াগুলি জলস্তরের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছেন গবেষকরা। রণধীরবাবু জানিয়েছেন, ১৯৯৭ সালে তাঁরা ব্যাকটিরিয়ার উপর কাজ শুরু করেছিলেন। সেসময় যে ব্যাকটিরিয়া এক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করতে পারত, সেই ব্যাকটিরিয়াই বর্তমানে ক্ষমতা বাড়িয়ে নতুন নতুন প্রজাতি তৈরি করেছে এবং ৭-৮ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করতে পারছে। প্রতিনিয়তই ক্ষমতা বাড়াচ্ছে ব্যাকটিরিয়াগুলি।

সুপার বাগ নিয়ে চিন্তিত চিকিৎসক ও পরিবেশবিদরাও। বিশিষ্ট চিকিৎসক শেখর চক্রবর্তী বলেন, আমরাও চিকিৎসার সময বিভিন্ন পরীক্ষা করতে গিয়ে এমন অনেক ব্যাকটিরিয়ার সন্ধান পেয়েছি যেগুলি একসঙ্গে বেশ কয়েকটি অ্যান্টিবায়োটিককে প্রতিরোধ করতে পারে। জিন পরিবর্তন করে ব্যাকটিরিয়াগুলির ক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত ভয়ংকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী সুভাষ দত্তের বক্তব্য, আমরা মৃত্যুর কারিগর হয়ে গিয়েছি। নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনছি। মহানন্দা, করলা সহ উত্তরবঙ্গের নদীগুলিতে দূষণ প্রতিরোধের কার্যত কোনও ব্যবস্থা নেই। একটা ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উত্তরবঙ্গের নদীগুলি হিমালয় থেকে নেমেই যেভাবে দূষিত হচ্ছে, সেটা আমাদের সকলের লজ্জার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, হাসপাতাল, নার্সিংহোমগুলিই রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটিরিয়ার আঁতুড়। সেইসব জায়গার বর্জ্য, নোংরা জলের সঙ্গেই প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে ব্যাকটিরিয়া এবং অব্যবহৃত বা অল্প ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক নদীর জলে মিশছে। অ্যান্টিবায়োটিকের জেরে জলে থাকা কিছু ব্যাকটিরিয়া মরে যাচ্ছে। আর কিছু ব্যাকটিরিয়া বাঁচার তাগিদেই নতুন রাস্তা বের করে শক্তিশালী হচ্ছে। গৃহস্থালি, বাজারঘাট, কারখানার বর্জ্য ও নোংরা জল নদীতে মিশেও জলে ব্যাকটিরিয়ার সংখ্যা বাড়াচ্ছে।