সেফ এরিয়া উত্তরবঙ্গ, লোন উলফ হামলার ছক জঙ্গিদের

747

শুভঙ্কর চক্রবর্তী  শিলিগুড়ি : বিভিন্ন কায়দায় বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন সময় আঘাত হেনেছে জঙ্গিরা। লোন উলফ সেরকমই একটি হামলার কায়দা। দল বেঁধে যাওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় নেকড়ে একা শিকার করতে বেরিয়ে পড়ে। এই ধারণা থেকেই লোন উলফ কায়দায় হামলার উদ্ভাবন। সংগঠনের প্রশিক্ষিত কোনও সদস্য এককভাবে হামলা করে কিছু মানুষকে হত্যা করে। কোনও স্কুল বা রেস্তোরাঁয় ঢুকে বেপরোয়া গুলি বা ছুরি চালিয়ে মানুষকে হত্যা করা, জনসমাবেশের মধ্যে গাড়ি চালিয়ে কিছু লোককে পিষে দেওয়ার মতো হামলাগুলি লোন উলফ স্টাইল হিসাবেই চিহ্নিত। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তথ্য বলছে, মূলত পশ্চিমের দেশগুলিতেই বারবার ওই কায়দায় জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। দুএকটি ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত মিল থাকলেও এখনও ভারতে ওই কায়দায় কোথাও হামলা হয়নি বলেই ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডস (এনএসজি) সূত্রে জানা গিয়েছে। তবে এনআইএ, এনএসজি এবং একাধিক কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুসারে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লোন উলফ পদ্ধতিতে হামলার ছক কষছে একাধিক জঙ্গি সংগঠন। এনআইএ সূত্রে জানা গিয়েছে, একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠী সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ডু ইট ইওরসেল্ফ (ডিআইওয়াই)-এর নামে লোন উলফ কায়দা শেখানোর কাজ চালাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইনের মাধ্যমে লোক বেছে বেছে মগজধোলাইয়ের পর সক্রিয় সদস্য তৈরি করা হচ্ছে। তারপর তাদের হামলার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও উত্তর-পূর্ব ভারত ও বিহারের একাধিক এলাকায় লোন উলফ তৈরির কাজ চলছে।

আইএস যোগের অভিযোগে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জয়পুর থেকে মহম্মদ সিরাজউদ্দিন নামে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের এক আধিকারিককে গ্রেপ্তার করে এনআইএ। তার কাছ থেকে দেশজুড়ে লোন উলফ কায়দায় হামলার বহু পরিকল্পনার তথ্য পায় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। পরবর্তী সময় আরও তথ্য আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের হাতে। তার ভিত্তিতেই উদ্বিগ্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ২০১৮ সালের ১৩ জুলাই দিল্লিতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডেকেছিলেন। বৈঠকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির সমস্ত শীর্ষ আধিকারিক এবং ১৩টি রাজ্যের পুলিশকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কীভাবে লোন উলফ হামলা ঠেকানো যাবে তা নিয়ে সেই বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা ও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে নাশকতা ঠেকাতে সেইমতো পদক্ষেপ করে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি। মাত্র এক মাস আগে ২১ অগাস্ট দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল আবু ইউসুফ খান নামে এক আইএস জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে। ওই জঙ্গির বাড়ি উত্তরপ্রদেশে। তার কাছ থেকে ১৫ কেজি ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসেস (আইইডি), দুটি প্রেশার কুকার, একটি অত্যাধুনিক পিস্তল উদ্ধার হয়। এনএসজি এবং এনআইএর আধিকারিকরা তাকে দফায় দফায় জেরা করেন। জানা গিয়েছে, সে প্রশিক্ষিত লোন উলফ। হামলার উদ্দেশ্যেই সে দিল্লিতে এসেছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আইএস-এর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল। অনলাইনেই সে নানা কার্যকলাপ সম্পর্কে জানে। পরে একাধিক শিবিরে প্রশিক্ষণ নেয়। হামলার জন্য অস্ত্র, বিস্ফোরক, অর্থের জোগান সে আইএস-এর কাছ থেকেই পেয়েছিল। ওই জঙ্গির কাছ থেকেই উত্তর-পূর্ব ভারত ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারে লোন উলফ তৈরির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য এনআইএর হাতে এসেছিল।

- Advertisement -

এনআইএ সূত্রে জানা গিয়েছে, মুর্শিদাবাদ ছাড়াও, মালদা, বর্ধমান, উত্তর দিনাজপুর, কোচবিহার, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকাকে সেফ এরিয়া হিসাবে ব্যবহার করে লোন উলফ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে একাধিক জঙ্গি সংগঠন। ডিআইওয়াই-এর নামে এলাকাগুলিতে সক্রিয় হয়েছে তারা।  জানা গিয়েছে, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ঘেঁটে সমমনোভাবাপন্ন ব্যক্তি খুঁজে তালিকা তৈরি করছে সন্ত্রাসবাদীরা। তারপর তাদের টার্গেট করে নানা প্ররোচনামূলক তথ্য সরবরাহ করে বন্ধুত্ব করছে। বন্ধুত্ব জমলেই শুরু হচ্ছে মগজধোলাই। এমনভাবে প্ররোচনা দেওয়া হচ্ছে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে অজানা প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হচ্ছে। সুযোগ বুঝে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ শিবিরে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রশিক্ষণ হচ্ছে না। দিনে কয়েক ঘণ্টার জন্য কয়েদিনেই প্রশিক্ষণ শেষ করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে নিজের ইচ্ছাপূরণের জন্য। এভাবেই একের পর এক লোন উলফ তৈরি করছে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন। এক্ষেত্রে মূল টার্গেট করা হচ্ছে যুবকদের। সোশ্যাল নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য বিশেষ সেল তৈরি করেছে তারা। শুধু আল-কায়দা বা আইএস নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতে সক্রিয় একাধিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনও লোন উলফ কায়দায় হামলার পরিকল্পনা করছে। মুর্শিদাবাদ ও কেরল থেকে ধৃত জঙ্গিরা প্রত্যেকেই লোন উলফ কায়দায় হামলার জন্য প্রশিক্ষিত হচ্ছিল বলেই এনআইএ সূত্রে জানা গিয়েছে। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের। নিম্ন অসম, অরুণাচলপ্রদেশের একাধিক এলাকা এবং মেঘালয়ের তুরায় লোন উলফ তৈরির সক্রিয়তার খবর পেয়েছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা কর্তারা।