বিপ্লব দাস, মাদারিহাট : পুজোর উৎসবে গা ভাসান আপামর বাঙালি। রাজ্যের প্রতিটি কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ আর খুশি। কিন্তু সর্বজনীন এই আনন্দের মাঝে ছোট্ট দ্বীপের মতো পুজোর আনন্দ থেকে শত যোজন মাইল দূরে থাকে মাদারিহাটের ছয়টি পরিবার। উলটে পুজো এলেই মন খারাপ হয়ে যায় এই কয়েকটি পরিবারের। কারণ, সকলের কাছে দুর্গাপুজো উৎসব এবং আনন্দের হলেও এঁদের কাছে এই দিনগুলি তাঁদের পূর্বপুরুষের হত্যার দিন। এঁরা হল মাদারিহাটের ছয়টি অসুর পরিবার।

দেবী দুর্গার সঙ্গে তাঁদের পূর্বপুরুষ মহিষাসুরের লড়াই এবং সেই লড়াইয়ে মহিষাসুরের মৃত্যুতে মা দুর্গার মুখ দর্শন করতে বারণ করেছিলেন পিতামহ, প্রপিতামহরা। সেই আদেশই পালন করে চলেছেন অসুর পরিবারের সদস্যরা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের অনেকটাই পালটে নিয়েছেন এঁরা। পুজোয় অংশ না নিলেও পরিবারের বাচ্চারা মেলায় যায়। তাদের প্রসাদ খেতেও বারণ করা হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, নৃতাত্ত্বিকভাবে প্রোটো অস্ট্রলয়েড গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত অসুর জনজাতির মানুষজন। মূলত ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা এই অসুর জনজাতির মানুষজন কাজের খোঁজে সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। আলিপুরদুয়ার ছাড়াও উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় এই অসুর জনজাতির দেখা মেলে। এই জনজাতিটি মনে করেন, তাঁদের পূর্বপুরুষ ছিলেন মহিষাসুর। দেবী দুর্গা তথা আরাধ্য প্রতিনিধির কাছে পরাজয় ও মৃত্যু হয় মহিষাসুরের। তাই দেবী দুর্গা অসুর সম্প্রদায়ের কাছে দুর্গতিনাশিনী নন, তাদের পূর্বপুরুষের হত্যাকারী।

মধ্য মাদারিহাট, দক্ষিণ মাদারিহাট, পশ্চিম মাদারিহাট, উত্তর খয়েবাড়িতে একই আত্মীয়পরিজনের মধ্যে ছয়টি পরিবার রয়েছে, যাদের পদবী অসুর। তাঁদের মতে, পৌরাণিক যুগে দেবী দুর্গার সঙ্গে যে অসুরের লড়াই হয়েছিল, তিনি ছিলেন তাঁদেরই পূর্বপুরুষ। এমনকি দেবী দুর্গাকে যে দেবতারা সাহায্য করেছিলেন, তাঁদেরও মুখ দর্শন করেন না এঁরা। মধ্য মাদারিহাটে দুই ভাই সোমা অসুর এবং বন্ধন অসুরের স্ত্রী এবং সন্তান মিলে ১২ জনের সংসার। দক্ষিণ মাদারিহাটেও তাঁদের আত্মীয় মাহাতো অসুর এবং মাতলু অসুর দুই ভাই ও তাঁদের কাকা চারুয়া অসুর পরিবার নিয়ে সেখানে থাকেন।

মাহাতো অসুর বলেন, আমার বাবা এবং ঠাকুরদা আমাদের দুর্গাপুজোয় বের হতে না করতেন। তাই এখনও পুজোর সময় ঠাকুর দেখতে কিংবা মেলায় ঘুরতে যাই না। তবে বাড়ির ছেলে-মেয়েরা মেলায় যায়। প্রসাদও খায়। তাতে বাধা দিই না। একই কথা জানান মাতলু অসুর, চারুয়া অসুর। বাড়ির খুদে সদস্যরা জানায়, দেবীর মুখ দর্শন না করলেও তারা প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে পুজো উপভোগ করে।