করোনা মুক্তির সাতদিন পরও খোলেনি ব্যারিকেড, ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্যকর্মীর পরিবার

251

তনয় মিশ্র, মালদাঃ করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেও প্রশাসনিক বা সামাজিক সাহায্য পাচ্ছেন না স্বাস্থ্যকর্মীরা। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সংবর্ধনা জানালেও মালদায় দেখা যাচ্ছে অন্য ছবি। মালদা জেলার কৃষ্ণ কালিতলা এলাকায় এক স্বাস্থকর্মী সংক্রমিত হওয়ার পর গত কয়েকদিন আগে সুস্থ হয়ে উঠলেও তার বাড়ির সামনে বাসের ব্যারিকেড এখনও খোলা হয়নি। এর ফলে স্বাস্থ্যকর্মীর পরিবার ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিযোগ করোনা যুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যদি একজন স্বাস্থ্য কর্মীও অপমানিত হন তবে তারা কাজ বন্ধ করবেন। ঘটনার প্রতিবাদ করেছেন বিভিন্ন নার্স অ্যাসোসিয়েশন। যদিও স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করা হয়েছে। করোনা যুদ্ধজয়ী কৃষ্ণপল্লির ওই নার্সের কাজে যোগদান দানের দিন পুলিশ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দপ্তর ওই ব্যারিকেড ভেঙে যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে সরকারি গাড়িতে হাসপাতালে নিয়ে আসবে বলে জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য মালদা শহরের বাসিন্দা হিসাবে কৃষ্ণ কালিতলা এই স্বাস্থ্যকর্মীর প্রথম করণা পজিটিভ হাওয়াই আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিল গোটা শহর এলাকায়। গত ৪ এই জুন পর্যন্ত এই স্বাস্থ্যকর্মী মালদা মেডিকেল কলেজের আইসোলেশন ওয়ার্ডে কাজ করে। ৪ জুন তার কাজ শেষ হলে সোয়াপ টেস্ট হয়। ৭ জুন তাকে জানানো হয় তার করোনা পজেটিভ আছে।এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই মালদা শহরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ নিজের বাড়িতে থাকে। গত ১৩ জুন এই স্বাস্থ্যকর্মীর সোয়াব টেস্টের রিপোর্ট নেগেটিভ হয়। স্বাস্থ্য দপ্তর তাকে সুস্থ বলে ঘোষণা করে। ওই স্বাস্থ্যকর্মীর সুস্থ হওয়া প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল । আগামী ২২ জুন সোমবার মালদা মেডিকেল কলেজে কাজে যোগদান করবেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে তার বাড়ির সামনের অংশের ব্যারিকেড প্রশাসন বা স্থানীয় মানুষরা না খুলে দেওয়ায় চরমভাবে লজ্জিত ও দুঃখিত হই স্বাস্থ্যকর্মী। তিনি ফোন করে তার দুক্ষের কথা স্বাস্থ্য দপ্তর কেউ জানান।

- Advertisement -

করণা যুদ্ধজয়ী স্বাস্থ্যকর্মী উমা বসাক জানান, ‘সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এই পেশায় এসেছি। এই পেশা ছেড়ে কোনদিন পালিয়ে যাব না। আমরা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে গেছে শপথ বাক্য পাঠ করে এই পেশায় এসেছি। তবে সংক্রমিত ব্যাক্তিদের পাশে গোটা সমাজের সামাজিক ও নৈতিকভাবে পাশে দাঁড়ানো উচিত। নইলে আগামীদিনে এই লড়াই আরো কষ্টসাধ্য হয়ে উঠবে। করোনা ভাইরাস নিয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতার প্রয়োজন বলে তিনি জানান। উমা বসাক জানান, ‘আমি আগামী সোমবার কাজে যোগদান করব। কিন্তু আমার বাড়ির সামনে আমার সংক্রমণ হওয়ার খবরে বাঁশ দিয়ে যে ব্যারিকেড করা হয়েছিল আমার সুস্থ হওয়ার ৭ দিন পরে খোলেনি। এই ঘটনা আমাকে লজ্জিত ও ব্যথিত করেছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়েছি।’

এই ঘটনা স্বাস্থ্যকর্মী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে আলোড়ন ফেলেছে। মালদা জেলা নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেত্রী জানিয়েছেন, ‘এই ঘটনা খুব দুঃখজনক। আমি বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরে আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। করোনা জয়ীদের আলাদা মর্যাদা পাওয়া উচিত। পুলিশ প্রশাসনের বিষয়টি দেখা উচিত। আমাদের একজন স্বাস্থ্যকর্মী যদি কোথাও অপমানিত বা লাঞ্ছিত হন তাহলে আমরা যদি আমাদের কাজ বয়কট করি তাহলে এই করোনা আবহে সমাজের প্রতিটি মানুষই বিপদে পড়বে। তাই আমরা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করেছি প্রশাসনের উচিত করোনা সংক্রমিত এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি করার।’

স্বাস্থ্যকর্মীর বাড়ির সামনের ব্যারিকেড না খোলায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্য দপ্তর আধিকারিকরা। মালদা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যক্ষ অমিত কুমার দা জানিয়েছেন, ‘এই ঘটনা যতটা দুঃখজনক ততটা অপমানজনক। স্বাস্থ্যকর্মী সমাজের অহংকার। স্থানীয় মানুষ তাই এগিয়ে এসে ওই ব্যারিকেড খুলে দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু তারা যে করেনি অত্যন্ত লজ্জার। তবে ওই স্বাস্থ্যকর্মী যেদিন কাজে যোগদান করবে সেদিন আমরা স্বাস্থ্য দপ্তরের গাড়ি নিয়ে গিয়ে ওই ব্যারিকেড ভেঙে তাকে সমর্যাদা ও সসম্মানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসব।’

মালদা জেলার স্বাস্থ্য দপ্তরের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ভূষণ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, ‘এটা খুবই লজ্জাজনক ঘটনা। আমি আজই পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেন সেই ব্যারিকেড ভেঙে দেওয়া হয়। প্রত্যেক করণা যুদ্ধজয়ীদের যেন বীরের মর্যাদা দেওয়া হয়। সে বিষয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এগিয়ে আসা উচিত।’