নিহত মদন ঘোড়ুইয়ের স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে অবস্থান বিক্ষোভে বিজেপি

261

কলকাতা: কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি মানথার নির্দেশের পরও ৮ দিন কেটে গেলেও পটাশপুরের দলীয় কর্মী মদন ঘোড়ুই এর দেহ দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করার ব্যবস্থা নেয়নি রাজ্য সরকার। আর তাঁরই প্রতিবাদে এদিন মধুমেহ রোগের স্ত্রী-পুত্র, বাবাকে সঙ্গে নিয়ে মধ্য কলকাতাঁর ধর্মতলায় মহাত্মা গান্ধী মূর্তির পাদদেশে এক অবস্থান বিক্ষোভে সামিল হয় বিজেপি।

এদিন সেই অবস্থান বিক্ষোভে বসে বিজেপি মহিলা মোর্চা সভানেত্রী অগ্নিমিত্রা পল বলেন, মানুষ খুন হোক বা ধর্ষন করে খুন করা হোক তাঁর ময়নাতদন্তের রিপোর্টগুলিকে এদিক ওদিক করে দেওয়াটা রাজ্য সরকারের কাছে কোনও ব্যাপার নয়। এছাড়া যেভাবে মরদেহ দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের জন্য গত ২০ অক্টোবর কলকাতা হাইকোর্ট রায় দিলেও আজ ৮ দিন কেটে গেলেও তাঁর দেহের কোন ময়নাতদন্ত করা হলো না কেন। আর এতেই তাদের সন্দেহ আরো বেড়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

- Advertisement -

তিনি এদিন অভিযোগের সুরে বলেন, ‘পরিবারের সদস্যরা তাঁর মরদেহ যেমন হাতে না তেমনি সিবিআই তদন্ত হচ্ছে না। এরাজ্যে গণতন্ত্র বলে কিছু আছে বলে মনে হয় না।’ তিনি অভিযোগ করে জানান, তৃণমূল কংগ্রেস বুঝে গেছে যে ক্ষমতাচ্যুত হচ্ছে তাঁরা। বিজেপি ক্ষমতায় আসছে। তাই পাগলা কুকুরের মতো আচরণ করছে।

এদিন তিনি বলেন, ‘নির্বাচন না হলেও মানুষের রায় কি হবে তা বুঝে গেছে শাসকদল। তাই বিজেপিকে আটকাতে সন্ত্রাসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে রাজ্য সরকার।’

মদন ঘোড়ার স্ত্রী জানান, তিনি তাঁর স্বামীর মৃতদেহ চান। তাঁর স্বামীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার পরে একজন সিভিক ভলেন্টিয়ারকে দিয়ে জানানো হয়েছিল যে তাকে থানায় দেখা করার জন্য। কিন্তু দিন আনা দিন খাওয়া পরিবার তাদের। তাই টাকার অভাবের জন্য তিনি যেতে পারেননি। এমনকি সিভিক ভলেন্টিয়ারকে তিনি তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। তিনি তাদের সে অনুরোধ কানে তোলেননি। এর কয়েকদিন পরে ওই সিভিক ভলেন্টিয়ার মারফত তাদের কাছে খবর পাঠানো হয় যে তাঁর স্বামী মারা গেছেন।

অন্যদিকে, তাঁর ছেলে জানান, তাঁরা চায় তাঁর বাবার মৃতদেহ পুনরায় ময়নাতদন্ত করে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক এবং দোষী পুলিশ অফিসার ও কর্মীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।

মদন ঘোড়ুইয়ের বাবা জানান, গত ২৬ সেপ্টেম্বর শনিবার বিকেলে বাজার থেকে পুলিশ তাঁর ছেলেকে তুলে নিয়ে যায়। তাঁরপর তাকে থানার মধ্যেই পুলিশ পিটিয়ে মেরে খুন করে। আর সেটা তাঁরা যেহেতু বিজেপি করেন তাঁর জন্যই এই মাশুল গুনতে হয়।

ওই ব্যপারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে জোর করে মদন ঘোড়ুই এর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে, মদন ঘোড়ুই এর মৃত্যু নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। পরে হাইকোর্ট থেকে তাঁরা পুনঃময়নাতদন্তের দাবি আদায় করলেও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সেই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ডিভিশন বেঞ্চ এবং পরে সিঙ্গেল বেঞ্চে যাওয়া হয়। ২০ অক্টোবর হাইকোর্ট ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিলেও তা কার্যকরী করা হচ্ছে না।

শুধু তাই নয় তাঁরা আরও অভিযোগ তোলেন, আদালতে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে মৃতদেহ ডিকম্পোজ হয়ে গিয়েছে। তাই পুনরায় তাঁর দেহ ময়নাতদন্ত করা সম্ভব নয় ময়নাতদন্ত করা সম্ভব নয়।

পরিবার অভিযোগ তোলেন, তাঁরা চান তাঁরা চান দিল্লির এইমস হাসপাতালে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত হোক। আর সেখানকার চিকিৎসকেরা যদি বলেন যে দেহ ডিকম্পোজ হয়ে যাবার জেরে ময়নাতদন্ত করা সম্ভব নয় তাহলে তাঁরা তা মেনে নেবেন।

উল্লেখ্য গত ২০ অক্টোবর বিজেপি কর্মী কালিপদ ওরফে মদন ঘোড়ুই এর মৃতদেহের দ্বিতীয়বার আরজিকর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি মানথা। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিচারপতি মানথার সেই নির্দেশের বিরুদ্ধে পুনরায় ডিভিশন বেঞ্চে একটি আপিল দায়ের করা হয়েছিল ওই ২০ অক্টোবর রাতে। বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় ও ও বিচারপতি অরিজিত বন্দ্যোপাধ্যায় ওই আবেদনের উপর কোন স্থগিতাদেশ দেননি। এরইমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের পুজোর ছুটি পড়ে দিয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ বিচারপতি মানথার আদেশের ওপর কোনো স্থগিতাদেশ না দেওয়া সত্ত্বেও রাজ্য সরকার কালিপদ বাবুর দেহের দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় তাঁর মরদেহটি এখনো পড়ে রয়েছে আরজিকর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে।

বিজেপির আইনি সেলের প্রধান আইনজীবী ব্রিজেশ ঝাঁ ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের ঐ আচরণে ব্যাপারে একটি আদালত অবমাননা সংক্রান্ত মামলার নোটিশ হাইকোর্টে জমা দিয়েছেন। তাঁর কপি ও রাজ্য সরকারের আইনজীবীকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কলকাতা হাইকোর্টে বর্তমানে চলছে পূজোর ছুটি। এরমধ্যে আগামী ৩ নভেম্বর অবসরকালীন একটি বেঞ্চ বসার কথা। তবে আবেদনকারীর সূত্রে পাওয়া খবরে জানা যায় যে রাজ্য সরকার বিচারপতি মানথার গত ২০ অক্টোবরের রায়ের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চে যে আপিল দায়ের করেছিলেন তাঁর ওপর শুনানি হওয়ার কথা ৫ নভেম্বর। কাজেই এরমধ্যে কালিপদ বাবু দেহের পুনরায় ময়নাতদন্তের ব্যাপারে রাজ্য সরকার আদালতের আদেশ মেনে দ্বিতীয়বারে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা না করলে দেহটি ওই অবস্থায় পড়ে থাকার সম্ভাবনা।

প্রসঙ্গত কিশোর ঘোড়ুই নামে পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরের বাসিন্দা এক যুবক ব্যাঙ্গালোরে পালিশের মিস্ত্রির কাজ করত। লকডাউন এর দরুন সে ফিরে আসে বাড়িতে। সেখানেই তাঁর প্রতিবেশী এক যুবতীকে নিয়ে সে পালিয়ে যায়। অপহৃতাঁর পরিবারের দাবি যে মেয়েটি নাবালিকা। সেই অনুসারে পটাশপুর থানা গত ২৪ জুলাই একটি অপহরণের মামলা রজু করে। কিশোর ঘোড়ুইকে ধরতে না পেরে পুলিশ তাঁর কাকা কালিপদ ঘোড়ুইকে গত ২৬ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করে।

কালিপদ বাবু ছিলেন এলাকার পরিচিত বিজেপি কর্মী। গ্রেপ্তারের পরেরদিনই সকালে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশের পক্ষ থেকে তড়িঘড়ি তাকে আদালতে পেশ করে জেল হেপাজত চাওয়া হলে ম্যাজিস্ট্রেট তাকে জেল হেপাজতে পাঠিয়ে দেন।

জেল হেপাজতে তাঁর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। কালিপদ বাবুর পরিবারের লোকেদের অভিযোগ যে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ থানায় কালিপদবাবু উপর ব্যাপক অত্যাচার চালায়। তাঁর বিরুদ্ধে তাদের মূল অভিযোগ ছিল তিনি একজন বিজেপিকর্মী। জেল হেপাজতে থাকার সময় কালিপদ বাবুর অবস্থার অবনতি হতে থাকলে জেল কর্তৃপক্ষ তাকে কলকাতাঁর প্রেসিডেন্সি জেলে স্থানান্তরিত করেন। সেখান থেকে তাকে প্রথমে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে কোনো অজ্ঞাত কারণে এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে কালিপদবাবুকে দক্ষিণ কলকাতাঁর রাম রিক হালকা হাসপাতাল নামে একটি ছোট হাসপাতলে স্থানান্তরিত করা হয়। আর সেখানেই গত ১৩ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। এরপরই শুরু হয় তাঁর দেহ নিয়ে টানাপোড়েন।

গত ১৫ অক্টোবর তাঁর দেহের ময়নাতদন্ত করা হয় এনআরএস হাসপাতালে। পরে তাঁর দেহ তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হলে তাঁরা কালিপদ বাবু দেহটি নিয়ে চলে আসেন বিজেপি রাজ্য দপ্তরে। পুলিশের আচরণে ক্ষুব্ধ বিজেপি ও কালিপদ বাবু পরিবার কলকাতা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন পেশ করে তাঁর দেহটি দ্বিতীয়বারের জন্য ময়না তদন্ত করার দাবি জানান। সেই সঙ্গে তাঁরা এ দাবি জানান যে তাঁরা চান কালিপদবাবু দেহ দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে এইমস এ ময়নাতদন্ত করার। আদালতকে তাঁরা জানিয়ে দেন যে দেহটি দিল্লিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে খরচ পড়বে আবেদনকারী সেই খরচ বহন করতে প্রস্তুত।

ওই আবেদন অনুসারে বিচারপতি মানথা অবিলম্বে কালিপদ বাবু দেহ দ্বিতীয়বার আরজিকর হাসপাতাল ময়নাতদন্ত করানোর নির্দেশ দেন। সিঙ্গল বেঞ্চের ওই আবেদনের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ডিভিশন বেঞ্চে আপিল করা হয়। ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিচারপতি অরিজিত বন্দ্যোপাধ্যায় মামলাটির সিঙ্গেল বেঞ্চে পাঠিয়ে দিয়ে নির্দেশ দেন রাজ্য সরকারের বক্তব্য শুনে বিচারপতি মানতা যেন তাঁর আদেশটি দেন। সেই নির্দেশ অনুসারে বিচারপতি মানথা গত ১৯ ও ২০ অক্টোবর ওই মামলাটির উপর শুনানি করে ৩০ পাতাঁর রায়ে তাঁর পূর্বেকার আদেশটি বহাল রাখেন। আর এর পরপরই রাজ্য সরকার আবার ওই আদেশের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চে দ্বারস্থ হলে ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেন যে আগামী ৫ নভেম্বরের আগে তাদের পক্ষে ওই মামলাটি র শুনানি করা সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে তাঁরা বিচারপতি মানথার ২০ অক্টোবর এর আদর্শের উপর কোনরকম স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করেন। ফলে বহাল থেকে যায় বিচারপতি মানথার ২০ অক্টোবর এর আদেশটি।