বদলালো না ছবিটা, কিডনি বিক্রি কারবার এখনও জাঁকিয়ে রয়েছে এই গ্রামে

220

হেমতাবাদ: চিত্রটা এখনও বদলায়নি। এখনও কিডনি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন রায়গঞ্জের বিন্দোল গ্রাম পঞ্চায়েতের জালি পাড়ার একাংশ বাসিন্দা। কেননা, কিডনি পিছু দর যে এখন অনেকটাই বেড়েছে। অন্যদিকে, এখন দেশ ছাপিয়ে বিদেশে পৌঁছে যাচ্ছে কিডনি। আর এই পাচার চক্রকে পরিণতি দিতে জালি গ্রামেই আস্তানা গেড়ে বসে রয়েছে মূল পাণ্ডা। তবে এখন আর প্রকাশ্যে নয়, সবটাই হয় গোপনে।গোটা বিষয়টি নিয়ে, জেলাশাসক অরবিন্দ কুমার মীনার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোনও মন্তব্য করতে চাননি তিনি।

স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় উন্নয়নের কোনও ছোঁয়া লাগেনি। মিলেছে শুধুই প্রতিশ্রুতি। অমিল সরকারি সুযোগ সুবিধা। ফলে সংসার চালাতে গিয়ে কালঘাম ছোটে তাঁদের। একপ্রকার বাধ্য হয়েই কিডনি বিক্রিতে সায় দিয়ে আসছেন তাঁরা। যদিও, এবিষয়ে জন প্রতিনিধিদের স্পষ্ট মন্তব্য, কিডনি বিক্রি করা জলভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে জালিপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের। অন্যদিকে, এই বিষয়কে সামনে রেখেই ভোটের প্রাক্কালে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি। একে অপরের কাঁধে দোষ চাপিয়ে নির্বাচনী প্রচার সারতে মরিয়া বিভিন্ন দল।

- Advertisement -

জালি গ্রামের এক যুবক চিয়ারু জালি বলেন, ‘স্ত্রী-ছেলেমেয়ে নিয়ে অভাবের সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য ফেরাতে এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে প্রায় চার বছর আগে একটি কিডনি বিক্রি করেছিলাম। কিডনি বিক্রির টাকায় বাড়িতে ছোট মুদির দোকান করে কোন রকমে সংসার চালাচ্ছি।’ অন্যদিকে বিমল নমোদাস, সুরেন জালি, ভবেশ জালিরা জানালেন, নেতা-মন্ত্রীরা দামি গাড়িতে চেপে গ্রামে ঢুকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কোথায় ১০০ দিনের কাজ? সব মিলিয়ে বছরে ১৫-২০ দিন কাজ জুটেছে। এতে কি সংসার চলে? গরিবদের জন্য কোথায় ইন্দিরা আবাসন বা সরকারি ভাতার সুযোগ? গ্রামে একটি মাত্র মার্ক-টু টিউবওয়েল রয়েছে। এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি পড়লেও আলো আসেনি। নেতারা ভোট নিয়ে চলে যান আর আমাদের দিকে ফিরেও তাকান না। তবে, ভোট আসলেই মেলে রাশি রাশি প্রতিশ্রুতি।

বিন্দোল গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান লায়লা খাতুন বলেন, ‘ওই গ্রামের জন্য একাধিক উন্নয়নমূলক কাজের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে পঞ্চায়েতের তরফে। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের আওতায় যাতে ওই গ্রাম আসে সেই ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে এই গ্রামের বাসিন্দাদের অভাব নয়, স্বভাবে পরিণত হয়েছে কিডনি বিক্রি করা।’

কংগ্রেসের জেলা সভাপতি মোহিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘বিন্দোল গ্রাম পঞ্চায়েত কংগ্রেসের দখলে থাকার সময় জালিপাড়া গ্রামে উন্নয়ন হয়েছে। বাম আমলেও অবশ্য উন্নয়ন হয়েছে।তৃণমূলের এই দশ বছরে হতদরিদ্র পরিবারের বাসিন্দারা আবাস যোজনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কাটমানি না দেওয়ার জন্যই ওই উপভোক্তারা সরকারি আবাস যোজনা থেকে বঞ্চিত।’

সিপিএমের জেলা সম্পাদক অপূর্ব পাল বলেন, ‘তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে ওই গ্রামে কোনও উন্নয়নমূলক কাজই হয়নি। হতদরিদ্র পরিবারের বাসিন্দারা অভাবের তাড়নায় কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।’ বিজেপির জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ লাহিড়ী বলেন, ‘আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসলে জালিপাড়া গ্রামকে মডেল গ্রাম করা হবে। হতদরিদ্র পরিবার পিছু সরকারি সমস্ত সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবে।’তৃণমূলের উত্তরদিনাজপুর জেলা সভাপতি কানাইয়ালাল আগারওয়াল বলেন, ‘রাজ্য সরকারের তরফ থেকে দু টাকা কেজি চাল ও গম, বিধবা ভাতা, বার্ধক্য ভাতা, সরকারি প্রকল্পের ঘর, ১০০ দিনের কাজ সহ সরকারি সমস্ত সুযোগ সুবিধা ওই গ্রামকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

নির্বাচনকে পাখির চোখ করে যে জালিপাড়ার ভোট ব্যাংক ধরে রাখতে রাজনৈতিক দলগুলি যে মরিয়া তা বলার অবকাশ রাখে না। তবে, ওই গ্রামে আদৌ উন্নয়নের ছোঁয়া লাগবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুধু জালিপাড়া নয় রায়গঞ্জ ব্লকের ভুঁইসমালি, ডোডরা, বালিয়াদিঘী, মুকুন্দপুর, শেরপুর, বিন্দোল, বাজে বিন্দোল, হেমতাবাদ ব্লকের কাশিমপুর, ঠাকুরবাড়ি, ভোগ্ৰাম, বিষ্ণুপুর, ভরতপুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেল একই হাল। জালিপাড়া গ্রামের নাম সংবাদ শিরোনামে উঠে আসলেও এই সমস্ত গ্রামের অবস্থা আরও বেহাল।