বিজেপিকর্মী রহস্য মৃত্যু মামলার তদন্ত ভার নিল সিআইডি

415

রায়গঞ্জ: অবশেষে বিজেপিকর্মী অনুপ রায় রহস্য মৃত্যু মামলার দায়িত্বভার নিল সিআইডি। শুক্রবার জেলা পুলিশ সূত্রে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। অনুপ রহস্য মৃত্যু মামলায় প্রথমেই নাম জড়িয়েছে পাঁচ পুলিশ কর্মীর এবং সেই পুলিশ অফিসাররা পুরোপুরি রায়গঞ্জ থানায় কর্মরত। ফলে রায়গঞ্জ থানার সমস্ত পুলিশ আধিকারিকদের কপালে খানিকটা হলেও চিন্তার ভাঁজ পড়ে গিয়েছে। সিআইডি তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে পুলিশের অত্যাচারে অনুপের মৃত্যু হয়েছে, তবে অভিযোগে নাম থাকা শুধু আধিকারিকরাই নয় থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও সেই দায় এড়াতে পারবেন না। এমনটাই মনে করছে পুলিশ মহল এবং তাদের বিরুদ্ধে সিআইডি তদন্তের স্বার্থে থানার অনেক পদস্থ কর্তাদেরও কোলজ করা হতে পারে বা অন্যত্র বদলি করা হতে পারে। এমনটাই মনে করছেন জেলা পুলিশ কর্তাদের অনেকেই।

অনুপ রায় খুনের মামলায় জেলা পুলিশ শুরুতে তদন্তের দায়িত্ব নিলেও যেহেতু পুলিশের বিরুদ্ধেই ওই খুনের অভিযোগ ওঠে, ফলে জেলা পুলিশ বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক তদন্তের কাজও করে উঠতে পারেনি বলে মনে করছেন পুলিশের একাংশ। রায়গঞ্জ থানার পুলিশ সুপার সুমিত কুমার বলেন,“অনুপ রায় রহস্য মৃত্যু মামলার তদন্তের দায়িত্ব সিআইডিকে আগেই আমরা হস্তান্তর করেছি। এখন সিআইডি সেই তদন্তের দায়িত্বভার নিয়েছে। তারা এখন তাদের মতো করে তদন্ত চালাবে। তাতে যদি কেউ অভিযুক্ত থাকে তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

- Advertisement -

এদিকে অনুপ রায় রহস্য মৃত্যু মামলায় সিআইডি তদন্তের দায়িত্বভার গ্রহণ করতেই শুক্রবার পুলিশ মহল থেকে রাজনৈতিক মহল এমনকি মৃতের গ্রামের বাসিন্দারাও খানিকটা হলেও আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। ২৪ বছরের এক নিরীহ, তরতাজা যুবকের প্রাণ কীভাবে, কারা কেড়ে নিল সেই খুনিদের হদিশ প্রায় দুর্গাপুরের নন্দন গ্ৰাম। গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, অনুপের মৃত্যু কোনওভাবেই স্বাভাবিক মৃত্যু হতে পারে না। ওকে নির্মমভাবে অত্যাচার করে খুন করা হয়েছে। যদিও খুনের মামলায় দুই বার ময়নাতদন্ত হয়। প্রথমবার পুলিশ কার্যত বিষয়টিকে আড়াল করার জন্য একটা স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালানোর চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত হয়েছে। যদিও সেই তদন্তের রিপোর্ট এখনও আসেনি। ইতিমধ্যেই অনুপের মা ইটাহার থানায় একটা খুনের মামলা দায়ের করে। সেই মামলার দায়িত্ব নেয় সিআইডি। ওই খুনের মামলায় জেলা পুলিশের তদন্ত একবিন্দু না এগোলেও, পরবর্তীতে সিআইডির হাতে সেই তদন্তভার দেওয়া হয়। এখন নন্দন গ্রাম তাকিয়ে আছে কবে সিআইডি আসবে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের কি ভূমিকা ছিল, পাঁচ পুলিশ অফিসার কি সেদিন অনুপকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল!

তবে আগ্নেয়াস্ত্রধারী পুলিশ পরিচয় দিয়ে যে অনুপকে বাড়ি থেকে তোলা হয়েছিল, সেটা আগেই জানিয়েছেন মৃতের মা। ছেলেকে শুধু নির্মমভাবে অত্যাচার নয়, তাকে গুলি করে খুন করা হয়েছে এমনটাই বারবার দাবি করেছেন মৃতের মা। শরীরের বিভিন্ন জায়গা যে ক্ষত-বিক্ষত এবং সেটা পরবর্তীতে সেলাই করে মৃতদেহ দেওয়া হয়। ওই মৃতদেহ নন্দনপুর গ্রামের বাসিন্দারা পুড়িয়ে না দিয়ে, সিবিআই তদন্তের আশায় তারা মৃতদেহ সংরক্ষণ করে কবরস্থ করেন। সেখানে পালা করে চলছে প্রতিদিনের রাত পাহারাও। কিন্তু এদিকে সিআইডি তদন্তের নির্দেশ মিলতেই রায়গঞ্জ থানা পুলিশ আধিকারিকদের একাংশের মধ্যে রীতিমতো কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গিয়েছে। এদিকে রহস্য মৃত্যুর ঘটনায় এফআইআর-এ পাঁচ পুলিশ অফিসারের মধ্যে তিন পুলিশ অফিসারকে গত চারদিন ধরে রায়গঞ্জ থানা চত্বরে দেখা মিলছে না। যদিও বাকি দুই অফিসার এখনও বহাল তবিয়তে তাদের কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। বাকি তিন অফিসার আচমকাই কি নিজেরাই গা-ঢাকা দিয়েছেন নাকি টানা ছুটিতে গিয়েছেন। তা নিয়েই এখন জল্পনা তুঙ্গে খোদ পুলিশ মহলেও। যদিও রায়গঞ্জ থানার আইসি সুরজ থাপাকে এই তিন অফিসারের অনুপস্থিতির বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি।

তবে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই তিন পুলিশ অফিসারকে গত কয়েক দিন ধরেই কাজে আসতে দেখা যায়নি। তারা এখন কোথায়, সে নিয়ে অন্ধকারে রায়গঞ্জ থানার পুলিশ আধিকারিকদের অনেকেই। অনুপ রায় রহস্য মৃত্যু মামলায় ইটাহার থানায় তাঁর মা পাঁচ পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে চলতি মাসের ৪ তারিখে এফআইআর করেছিলেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, রায়গঞ্জ থানার পাঁচ পুলিশকর্মী এসে তার ছেলেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে খুন করেছে। এই মামলায় পুলিশ তদন্তের কথা বললেও, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে যদিও ইতিমধ্যেই জেলা পুলিশ হাত গুটিয়ে নিয়ে খূনের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্বভার সিআইডির হাতে তুলে দিয়েছে। সিআইডির অফিসাররা কী এবারে ওই পাঁচ পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন এবং সেই নিয়ে কিন্তু এখন জল্পনা শুরু হয়েছে পুলিশ মহলেও। যদিও পুলিশেরই একাংশ জানিয়েছে, ওই পাঁচজন পুলিশ অফিসারের মধ্যে দু’জন ওই ঘটনায় জড়িত ছিল না এবং তারা যে কোনও উচ্চপর্যায়ে তদন্তের মুখোমুখি হতেও তাদের আপত্তি নেই বলে তাদের ঘনিষ্ঠ মহল জানিয়েছেন। তবে অভিযুক্ত বাকি তিন পুলিশ অফিসার কী অনুপের রহস্য মৃত্যু মামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে? এখন কিন্তু সেই প্রশ্নই পুলিশ মহলেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

যদিও মৃতের পরিবারের দাবি, অনুপকে কোথায়, কারা খুন করেছে, সিসিটিভি ক্যামেরার বিভিন্ন এলাকার ফুটেজ দেখলেই সিআইডির কাছে সেটা জলের মতোই স্পষ্ট হয়ে যাবে। তবে পুলিশ যে তাকে লকআপে নিয়ে এসেছিল এবং তাকে লকআপে ঢুকিয়ে তাঁর ওপর নির্যাতন হয়েছিল, সেই বিষয়টিও কিন্তু বারবার অভিযোগে উঠে এসেছে। এছাড়াও অনুপকে থানার বাইরে নিয়ে গিয়ে কী এনকাউন্টার করার উদ্দেশ্য ছিল? সেই প্রশ্নও কিন্তু নানা মহলেই উঠে এসেছে। সিআইডি কী অনুপ রহস্য মৃত্যু মামলায় অভিযুক্তদের শীঘ্রই চিহ্নিত করতে পারবে? নাকি জেলা পুলিশের মতো সিআইডি তদন্তও ঠান্ডা ঘরে লাল ফিতের ফাঁসে আটকে যাবে!

যদিও মৃতের পরিবার আশা ছাড়তে নারাজ। তারা বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনে সিবিআই তদন্তের দাবিতে সরব হয়েছেন। অনুপ রহস্য মৃত্যু মামলায় ইতিমধ্যেই গেরুয়া শিবিরের নেতাকর্মীদের টানা ডিউটিতে না আসা তিন পুলিশ অফিসারের দিকে অভিযোগের আঙুল তো রয়েছে, এছাড়াও আরও দুইজন অফিসার যাদের নাম নথিভুক্ত হয়নি তাদের নামও বিভিন্ন মহল থেকে উঠে এসেছে। অভিযুক্ত বাকি যে দু’জন পুলিশ অফিসার থানায় কর্মরত রয়েছেন তাদের নাম জড়ানোটাও ওই মামলায় সঠিক নাও হতে পারে এমনটাও মনে করছেন গেরুয়া শিবিরের নেতারা। তারা চাইছেন যে, প্রকৃত যারা অপরাধী তারাই শাস্তি পাক। অন্য কারও বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক সেটা চাইছে না পরিবারের লোকেরাও। তবে ছেলেকে যে খুন করা হয়েছে এবং সেই খুনিদের চরম শাস্তির চেয়ে মৃত অনুপ রায়ের মা গীতারানী বর্মন রায় এখনও দুই হাত তুলে ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করে চলেছেন।

এদিকে, বারবার কেন এধরনের একের পর এক বিতর্কে জড়িয়েছে রায়গঞ্জ থানার শীর্ষকর্তারা। এর পিছনে কি শুধু রাজনৈতিক প্রভাব, নাকি রয়েছে বড় রকমের কোনও লেনদেনের বিষয়। সেই বিষয়টিও কিন্তু বারবার বিভিন্ন মহলে উঠে এসেছে। বিজেপির জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ লাহিড়ী বলেন, “বৃহস্পতিবার রাজ্য নেতৃত্ব ফোন করেছিল আমাকে। অনুপের মা’কে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য হাইকোর্টের মামলার জন্য অনুপ রায়ের মায়ের স্বাক্ষর লাগবে। পাশাপাশি সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে দিল্লিতে। সেখানেও সুপ্রিম কোর্টের সিবিআই তদন্ত দাবি করার জন্য রিট পিটিশনে সই করতে হবে। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার।”