নটরাজনের মধ্যে জাহিরের ছায়া দেখছে ক্রিকেটমহল

অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : সাক্ষাৎ রূপকথা! জিরো থেকে হিরো হয়ে ওঠার আদর্শ কাহিনী।

তামিলনাডুর সালেম জেলার চিন্নাপামপাত্তি গ্রামের নাম ভারতীয় ক্রিকেটমহলে কেউ কোনওদিন শুনেছে বলে মনে হয় না। অথচ ছোট্ট এই গ্রাম এখন সংবাদ শিরোনামে। এই গ্রাম থেকে উঠে এসে স্যর ডন ব্র‌্যাডম্যানের দেশে স্টিভেন স্মিথ, গ্লেন ম্যাক্সওয়েদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন থাঙ্গারাসু নটরাজন। সংক্ষেপে যাঁকে টি নটরাজন নামে চিনে ফেলেছে ক্রিকেট দুনিয়া। ক্যানবেরার মানুকা ওভালে কেরিয়ারের প্রথম ওয়ান ডে ম্যাচে সুযোগ পেয়ে নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। সিরিজের প্রথম টি২০ ম্যাচেও একইভাবে বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা আদায় করে নিয়েছেন নটরাজন।

- Advertisement -

ত্রয়োদশ আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচে বিরাট কোহলিকে আউট করেছিলেন। চেন্নাই সুপার কিংসের বিরুদ্ধে ম্যাচে মহেন্দ্র সিং ধোনিকেও ফিরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তারপরও তাঁকে নিয়ে দারুণ হইচই হয়নি। সম্প্রতি সেটা শুরু হয়েছে ব্যাকআপ বোলার হিসেবে অস্ট্রেলিয়া পৌঁছে আচমকাই টিম ইন্ডিয়ার প্রথম একাদশে সুযোগ পেয়ে পারফর্ম করার পর। নভদীপ সাইনি ও বরুণ চক্রবর্তীর পরিবর্ত হিসেবে নটরাজন টি২০ ও ওডিআই স্কোয়াডে সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু এখন আর সেকথা কেউ মনে রাখেনি। বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের মঞ্চে দারুণ পারফর্ম করে নিজের সঙ্গে কিংবদন্তি জাহির খানের তুলনা টানার মঞ্চ গড়ে দিয়েছেন নটরাজন। ধারাভাষ্যের মাঝে সঞ্জয় মঞ্জরেকার বলে ফেলেছেন, টি২০ বোলার হিসেবে মহম্মদ সামির উপর চাপ বাড়িয়ে দিল নটরাজন। এরপর জসপ্রীত বুমরাহর সঙ্গে ওকেই প্রথম একাদশে নিতে চাইবে কোহলিরা।

শেষপর্যন্ত নটরাজনের কেরিয়ার কোন পথে এগিয়ে যাবে, সময় বলবে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে দুই ম্যাচে পাঁচ উইকেট নিয়ে শুরুটা দারুণ হয়েছে। তামিলনাডুর সালেম জেলা থেকে নটরাজনের ছোটবেলার কোচ তথা প্রাক্তন ক্রিকেটার ভরত রেড্ডি উত্তরবঙ্গ সংবাদ-কে বলছিলেন, নটরাজন অসম্ভব পরিশ্রম করতে পারে। শেখার ইচ্ছা সাংঘাতিক। লকডাউনের মাঝেও ক্রিকেট অনুশীলন চালিয়ে গিয়েছিল। আমি অবাক হব না, যদি আগামীদিনে নটরাজন ভারতীয় দলের তিন ফর্ম্যাটেই নিয়মিত হয়ে ওঠে। লকডাউনের কঠিন দিনগুলোয় কী করেছিলেন নটরাজন? তাঁর কোচ ভরত রেড্ডি শোনালেন অদ্ভুত কাহিনী। বলে দিলেন, সালেম জেলার যে গ্রামে ও থাকে, সেখানে কোনও জিম নেই। তাই কাঁধে জলের ক্যান নিয়ে নিয়ম করে প্রায় এক ঘণ্টা দৌড়োত ও। আর বাইশ গজের মাঝে নষ্ট হয়ে যাওয়া গাড়ির টায়ার রেখে তার মাঝে বল ফেলে ইয়র্কার অভ্যাস করত। সেসবেরই ফল পাচ্ছে এখন ও।

নটরাজন বিস্ময়ে শেষ এখানেই নয়। বরং শুরু। আইপিএলের সাফল্য, জাতীয় দলে ঢুকে পড়ার পর ২৯ বছরের নটরাজন এখন ইংরেজি শেখার পণ করেছেন। টিম ইন্ডিয়ার সতীর্থদের ধরেছেন ইংরেজি শেখার জন্য। সতীর্থরাও তাঁকে সাহায্য করছেন। ভারতীয় দলের বোলিং কোচ ভরত অরুণ তামিলনাডুর প্রতিনিধি বলে তিনিই বাকিদের সঙ্গে সেতুবন্ধনের কাজটা করছেন। নটরাজনের কোচ ভরত রেড্ডি বলছিলেন, মিলিয়ে নেবেন আমার কথা, আর কয়েক মাসের মধ্যে ইংরেজি ভাষাটাও রপ্ত করে ফেলবে ও। কারণ, নতুন কিছু শেখার চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করে ও। ভারতীয় ক্রিকেটে দীর্ঘসময় ধরে ভালোমানের বাঁহাতি পেসারের অভাব। জাহির খানের অবসরের পর থেকে এখনও কাউকে পাওয়া যায়নি। অথচ খলিল আহমেদের মতো অনেকেই নানা সময়ে সুযোগ পেয়েছেন। আর ব্যর্থ হয়েছেন। এই জায়গাতেও নটরাজন ব্যতিক্রম হতে চলেছে বলে মনে করছেন চেতন শর্মা, পরশ মামরেদের মতো জাতীয় দলের প্রাক্তন পেসাররা।

চেতন শর্মা উত্তরবঙ্গ সংবাদ-কে মোবাইলে বলছিলেন, বছর খানেক আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে তামিলনাডুর হয়ে নটরাজনকে খেলতে দেখেছিলাম একটি ম্যাচে। বিশ্বাস করুন, দারুণ কিছু মনে হয়নি। কিন্তু ত্রয়োদশ আইপিএল থেকে নটরাজনের বোলিং দেখে চমকে গিয়েছি। নিজেকে আমূল বদলে ফেলেছে। জাহিরের পর দেশের অন্যতম সেরা বাঁহাতি পেসার হয়ে উঠলে আমি অন্তত অবাক হব না। যদিও সময় দিতে হবে ওকে। অনেকটা একইভাবে প্রাক্তন পেসার মামরে বলছিলেন, নটরাজনের বোলিং যতটুকু দেখেছি, মনে হয়েছে লম্বা সময় থাকার জন্যই এসেছে ও। লাইন-লেংথ দারুণ। ইয়র্কারটাও ভালো করতে পারে। শুধু আর একটু গতি বাড়ানোর পরামর্শ দেব ওকে। জাহিরের শূন্যস্থানপূরণের ক্ষমতা রয়েছে ওর। সবমিলিয়ে নটরাজন ভারতীয় ক্রিকেটকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। স্বপ্ন জাহিরের শূন্যস্থান পূরণের পাশে ভারতীয় ক্রিকেটে আরও সাফল্যের।