মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, জয়গাঁ : ভারতীয় ভূখণ্ডে থাকা ছোট পাহাড়টির গায়ে ধাপ কেটে গড়ে উঠেছে শয়েশয়ে বাড়ি। বাদ যায়নি পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণার জল বয়ে যাওয়ার খাতটিও। খাত দখল করেই গড়ে উঠেছে ঘন জনবসতিপূর্ণ একের পর এক মহল্লা। যেগুলির মধ্যে ঝর্ণা বস্তি অন্যতম। আর তোর্ষা নদীর চর দখল করে গড়ে ওঠা গুয়াবাড়ি এখন জয়গাঁর অন্যতম ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকা। ওই জায়গাগুলিতে রাজনৈতিক মদতে রেজিস্ট্রেশনবিহীন জমি কেনাবেচার কারবার করে ফুলেফেঁপে উঠছে একশ্রেণির মাফিয়া। এলাকাবাসীর জমির অধিকার বলতে কোনওরকমে বেড়া দিয়ে স্রেফ দখলটুকু ধরে রাখা। হাত ফসকালেই জমি চলে যাবে অন্যের দখলে। কারণ, জমি কেনাবেচার বৈধ কোনও নথিপত্রই নেই ওঁদের।

জয়গাঁ-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ফুরবা লামা বলেন, হুহু করে ভিড় বাড়ছে জয়গাঁয়। এখানে যাঁরা বসবাস করছেন, তাঁদের ৯০ শতাংশই বহিরাগত। এমনকি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশের বাসিন্দারাও নির্বিঘ্নে বসতি গড়ছেন এখানে। কারণ, দালালকে টাকা দিলেই মিলছে ভুয়ো ভোটার কার্ড। জয়গাঁ-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ভোটার কমবেশি মাত্র পঁচিশ হাজার হলেও ওই এলাকায় বসবাস করছেন কমপক্ষে আড়াই লক্ষ মানুষ। ভোটার না হয়ে জয়গাঁয় বছরের পর বছর ধরে বসবাস করছেন অনেকেই। তবে আলিপুরদুয়ারের অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমিসংস্কার) দীপঙ্কর পিপলাই বলেন, অন্য দেশের নাগরিকরা আবেদন করলেও জমির স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।

- Advertisement -

এলাকায় খোঁজখবর নিয়ে জানা গিয়েছে, জয়গাঁয় জমি কিনতে গেলে বৈধ পরিচয়পত্র লাগে না। স্রেফ টাকা থাকলেই হল। আর কাগজপত্রবিহীন জমি কেনাবেচার কারবারে যে বরাবরই রাজনৈতিক মদত রয়েছে তা জয়গাঁয় ওপেন সিক্রেট। মূলত, রাজ্যে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজনৈতিক নেতাদের মদতে জয়গাঁয় জমি দখল ও কেনাবেচার রমরমা শুরু হয় বলে জানান জয়গাঁর একাধিক প্রবীণ বাসিন্দা। জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের আদি বাসিন্দাদের ভিড় সেখানে। তবে জয়গাঁর দুটি গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকাগুলিতে ভারতীয়দের সঙ্গে সমানভাবে ভিড় করছেন নেপাল, ভুটান এমনকি বাংলাদেশের বাসিন্দারাও বলে অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেরই অভিযোগ, নেপালের অনেক বাসিন্দাই দীর্ঘদিন ধরে জয়গাঁয় বসবাস করতে করতে ভারতীয় নাগরিকে পরিণত হয়েছেন। এদিকে ভুটানের নাগরিকরাও আর্থিক সুবিধা পেয়ে দলে দলে বাড়ি ভাড়া নিচ্ছেন জয়গাঁয়। রেজিস্ট্রেশনবিহীন জমি কেনাবেচার রমরমার সুযোগে অনেক ভুটানি জয়গাঁয় বাড়িও বানিয়ে ফেলছেন। গুয়াবাড়ির বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, জয়গাঁতে ভুটানের নাগরিকদের বাড়ি ভাড়া নেওয়ার মূল কারণ আর্থিক। গেটের ওপারে ফুন্টশোলিংয়ে বাড়ি ভাড়ার যে হার, গেটের এপারে জয়গাঁতে তার প্রায় অর্ধেক। অনেক ভুটানি প্রথমে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পরে বাড়ি কিংবা জমিও কিনে নিচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানান, রাজনৈতিক দলের মদতপুষ্ট দাদাদের অঙ্গুলিহেলনেই চলে জমি কেনাবেচার কারবার। শুধু কেনাবেচাই নয়, ফাঁকা জায়গা দখল করে জমি হিসেবে বিক্রি করা, এমনকি কারও ফেলে রাখা জমি দখল করেও বিক্রি করে দেওয়ার মতো গাজোয়ারি কারবারের পুরোটাই নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনৈতিক লাগামেই। বিজেপির আলিপুরদুয়ার জেলা সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত রায় বলেন, জয়গাঁতে জমি কেনাবেচার অবৈধ কারবারের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে তৃণমূলের মদতপুষ্ট মস্তানরা। আরএসপির আলিপুরদুয়ার জেলা কমিটির সদস্য জন ফিলিপ খালকো বলেন, জয়গাঁয় জমি কেনাবেচার কারবারে রাজনৈতিক মদত রয়েছে। তবে বাম জমানায় এটা ছিল না। তৃণমূলের আলিপুরদুয়ারের জেলা সভাপতি মৃদুল গোস্বামী বলেন, এ ধরনের কোনও চক্রের কথা জানা নেই। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর এ ধরনের চক্রগুলিকে দমন করা হয়েছে। আর দলের তরফে কোনও বেআইনি কাজকর্মকে মদত দেওয়ার প্রশ্নই নেই।