স্বপ্নের ফুটবলারের জীবনাবসানে যেন কৈশোরের সমাপ্তি

দক্ষিণ আমেরিকার এক খেলোয়াড়ের জন্য কেন এত শোক? বিশেষ করে যে মানুষটির জীবনটাই ভুল আর বিতর্কে ঠাসা। এক মাদকাসক্ত, খামখেয়ালি, ভুলে ভরা মহানায়ক যাঁর খেলোয়াড়ি মনোবৃত্তি নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন। তাহলে এই তীব্র শোকের প্রকাশ কি কেবল তাঁর প্রতি শর্তহীন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ? লিখেছেন অতনু বিশ্বাস

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মারা যাওয়ার পর আমার কলেজ পড়ুয়া ছেলে বলে বসল, ২০২০-তে নাকি পরিসমাপ্তি ঘটল ওর শৈশবের। ইউদেরজো আর সৌমিত্রর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শৈশবের অবসান। অ্যাস্টেরিক্স আর উদয়ন পণ্ডিত তাহলে একযোগে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে জেনারেশন জেড-কে? ছেলের কথাটা নিয়ে ভাবতে বসলাম। আমাদের শৈশব, কৈশোর, যৌবন, সব কিছুরই খণ্ড অস্তিত্ব কি তাহলে জেগে থাকে কোনও না কোনও আধারের মধ্যে? কখনও সেই আধার হয়তো কোনও নায়ক। বাস্তবের কিংবা কল্পকাহিনীর। কখনও আবার তাদের স্রষ্টার মধ্যেও তা হওয়া সম্ভব! ভয়াবহ ২০২০ যে বিষণ্ণতার সুর বইয়ে দিয়েছে, তার প্রবাহ যেন অবিরাম। আমার কাছে করোনাকালের সবচাইতে বড় ইন্দ্রপতন অবশ্য ফুটবলের রাজপুত্রের বিদায়। ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় আমার বয়স ছিল ১৬। সেই অল্প বয়স এক অনবদ্য ম্যাজিশিয়ানকে দেখে ফেলে। তাঁকে ভালোবেসে, তাঁর জাদুতে মোহিত হয়ে কেটে যায় আমাদের কৈশোর এবং সদ্য তারুণ্য। আমার এবং আমার প্রজন্মের অগণিত মানুষের কৈশোর-তারুণ্যের একটা টুকরো হয়তো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির ওই ভুলে ভরা আর্জেন্টাইন ম্যাজিশিয়ানের সঙ্গে। তাই, ভাবতে বসি, আমার খণ্ড কৈশোরেরও কি মৃত্যু হল না মারাদোনার সঙ্গে?

- Advertisement -

২৫ নভেম্বর। বোস্টন থেকে বুসান, মুম্বই থেকে মেক্সিকো সিটিজুড়ে হাহাকার আর বিষণ্ণতা। পৃথিবী যেন থমকে গেল কয়েক ঘণ্টার জন্য। মারাদোনার মৃত্যুর শোক আর তার অভিব্যক্তি মনে করিয়েছে এলভিস, ডায়ানা কিংবা মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু পরবর্তী বিশ্বজুড়ে শোকের ইতিবৃত্তকে। কিন্তু সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার এক খেলোয়াড়ের জন্য কেন এত শোক সারা দুনিয়ার? বিশেষ করে সেই মানুষটির জীবনটাই হয়তো ভুল আর বিতর্কে ঠাসা। এক মাদকাসক্ত, খামখেয়ালি, ভুলে ভরা মহানায়ক যাঁর খেলোয়াড়ি মনোবৃত্তি নিয়ে উঠেছে বিশাল প্রশ্নচিহ্ন। তাহলে এই গ্রহের কোনায় কোনায় তীব্র শোকের প্রকাশ কি কেবল তাঁর প্রতি শর্তহীন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ? নাকি বয়সভেদে যার যার নিজের নিজের শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য কিংবা যৌবনের একটা করে টুকরো হারিয়ে ফেলার বেদনার অভিব্যক্তি? মারাদোনা জিনিয়াস। ব্যতিক্রমী ফুটবলার। অসাধারণ বিনোদনকারী। ফুটবল মাঠে তাঁর চাইতে বড় বিনোদনকারী বোধহয় আর কেউ নেই। জীবনকালেই প্রায় ঈশ্বরত্বে উপনীত এক খেলোয়াড়। ফুটবল মাঠে মারাদোনাই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় কি না, সে বিতর্ক অবশ্য নেহাতই শিশুসুলভ। সফল খেলোয়াড়, মহান খেলোয়াড় আরও অনেক রয়েছেন, ছিলেন, আসবেন। তাঁদের মধ্যে কে মহত্তম, সে বিতর্ক যেন অন্ধকার ঘন কুয়াশায় হাতড়ে পথ খোঁজার মতো সময়ে অপচয়। এই ধরনের যে কোনও প্রচেষ্টা শেষমেশ সমাধানহীন থাকতে বাধ্য।

তবে দুনিয়াজুড়ে মারাদোনাই হয়তো জনগণেশের ভালোবাসায় সবচাইতে বেশি ঋদ্ধ খেলোয়াড়। কিন্তু এই গভীর ভালোবাসার সত্যিকারের কারণ কী? এটা ঠিক, মারাদোনা জিততে চেয়েছেন প্রবলভাবে। খেলার মাঠে। জীবনে। যে কোনও উপায়ে নিজেকে নিংড়ে, সম্পূর্ণ উজাড় করে। এমনকি প্রয়োজনে নিয়মকানুন আর খেলার আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। তথাকথিত এলিট খেলোয়াড়ি মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ নয়, তাঁর এই জয় ছিনিয়ে নেওয়ার মানসিকতাই কি তাহলে পছন্দ দুনিয়াজোড়া আমজনতার? তাই কি মারাদোনা এত প্রিয়? আর্জেন্টিনায়। আর্জেন্টিনার সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক দুনিয়াতেও। ১৯৮৬-তে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বহুচর্চিত সেই খেলায় হাতের টোকায় গোল দিয়ে ফেললেন মারাদোনা। তৈরি হল ফুটবলের নতুন ইতিহাস। এর ফলে শুধুমাত্র ইংরেজ গোলকিপার পিটার শিলটন কিংবা ইংল্যান্ড দল নয়, গোটা ব্রিটিশ মিডিয়া বা ইংরেজ জাতটাই মারাদোনাকে ঘৃণা করে আসছে গত ৩৪ বছর ধরে। এমনই সেই রাগ আর ঘৃণার গভীরতা যার পরিসমাপ্তি ঘটে না এমনকি মহা-মহাতারকার মৃত্যুতেও। বিদ্বেষকেও তারা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে দুনিয়ার অনেকটা জুড়ে। অথচ ভেবে দেখলে, এটা এমন কোনও সাংঘাতিক অপরাধ নয় যা মারাদোনাই প্রথম করলেন কিংবা তিনিই শেষ। ফুটবল বা অন্য খেলাধুলোর ক্ষেত্রে রেফারি বা আম্পায়ারের চোখে ধুলো দিয়ে অন্যায় সুবিধা নেওয়ার প্রচেষ্টা তো চিরায়ত। ফুটবলের আইনে মারাদোনার অপরাধটা অর্থাৎ হাত দিয়ে গোল দেওয়ার চেষ্টা কেবল একটা হলুদ কার্ড দেখার উপযুক্ত। ব্যাস। সেই খেলার শেষে মারাদোনাই বলে ফেললেন, গোলটার পিছনে ছিল ঈশ্বরের হাত। কে জানে, মারাদোনার কাছে ছিয়াশির বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই প্রথম গোলটা হয়তো তাঁর চার বছর আগেকার ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধও ছিল। অবশ্য তা যেন ছেলেমানুষের প্রতিশোধ।

ইংল্যান্ডের অত হা-রে-রে-রে করে ওঠার পিছনেও হয়তো সেই ফকল্যান্ড নিয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে তিক্ততার ছায়া ছিল। সেই সঙ্গে দীর্ঘদেহী ইংরেজ গোলকিপার কেন লাফ দিয়ে মাত্র পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির মারাদোনার কাছ থেকে বলের দখল নিতে পারেননি, সেই প্রশ্ন ঢেকে দেওয়ারও হয়তো একটা চেষ্টা ছিল এটা। ১৯৯০-এর ইতালি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নেপলসে খেলা হয় ইতালি আর আর্জেন্টিনার। নেপোলিতে দীর্ঘদিন খেলার সুবাদে এবং সেই অঞ্চলে বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে মারাদোনা স্থানীয় দর্শকদের অনেককে তাঁর সমর্থনে গলা ফাটাতে উদ্বুদ্ধ করেন সেই খেলায়। খেলায় জেতে আর্জেন্টিনা। ইতালির অনেকখানি অংশও কিন্তু ক্ষমা করতে পারেনি মারাদোনাকে। হয়তো আজও। মারাদোনা জিততে চেয়েছেন আর সেই জয়ে যাত্রাপথে যাদের যাত্রাভঙ্গ হয়েছে, তাদের অনেকেই পছন্দ করেনি ফুটবলের রাজপুত্রকে। মারাদোনা অবশ্য ক্ষমা চাননি কোনও দিন। তিনি চেয়েছেন রাজমুকুট। সব সময়। তাই এক অনাবিল অহংকার হয়ে ওঠে তাঁর অলংকার। এমন হতেই পারে যে, অজস্র ভুলে ভরা মারাদোনার জীবনের সঙ্গে নিজেদের জীবনস্পন্দনকে একাত্ম করতে পেরেছে অগণন সাধারণ মানুষ। মারাদোনা তাই হয়ে উঠেছেন তাদের কাছের মানুষ। নিজেদের লোক। আত্মার আত্মীয়। সার্বিক ভালোবাসা তাই উপচে পড়েছে মানুষটার প্রতি। তাঁর প্রথাগত শিক্ষা-সংস্কৃতির অভাব, তাঁর সুরাসক্তি, মাদকাসক্তি, নারীসঙ্গ, ক্ষেত্রবিশেষে দুর্বিনীত আচরণ তাঁকে রক্তমাংসের মানুষ করে তুলেছে। সে যেন আমাদের ধরাছোঁয়ার মধ্যে। দেবতা যেন হয়ে ওঠে প্রিয়, আবার প্রিয়ই হয়ে ওঠে দেবতা।

যেসমস্ত তারকা নিখুঁত থাকতে পারেন তাঁদের অভিব্যক্তিতে, তাঁরা হয়তো হয়ে ওঠেন কল্পলোকের বাসিন্দা। তাঁদের তাই শ্রদ্ধা করেন সাধারণ মানুষ। ভালোবাসাটা হয়তো উপচে পড়ে মারাদোনাদের জন্য। মারাদোনা বামপন্থী ছিলেন কি না, ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে তাঁর কী সম্পর্ক ছিল, তা নিয়ে আমাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। মারাদোনার লেগ্যাসি তাঁর ফুটবল প্রতিভাকে ঘিরেই। তবে জিনিয়াসদের অসাধারণত্ব হয়তো অনেক সময় ঠিক বিনামূল্যে হয় না। তার সঙ্গে জুড়ে থাকে খানিকটা পাগলামি, থাকে বন্যতার ছোঁয়াও। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁকে মাশুল দিতে হয় অন্যভাবে। মারাদোনাও বোধহয় ব্যতিক্রম নন। ছিয়াশির ইংল্যান্ড ম্যাচে মারাদোনার দ্বিতীয় গোল যেন স্বপ্নের গোল যাকে শতাব্দীর সেরা গোল বলেছেন অনেকে। সেসময়ে মারাদোনা তাঁর ফর্মের চূড়োয়। প্রতিভার সেই চূড়ান্ত প্রকাশের সঙ্গে যুঝে ওঠা প্রতিপক্ষের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তাঁর বুট যেন চুম্বক। সেই মারাদোনা যেন এক ছোটখাটো ষাঁড়, কিন্তু যিনি ছুটে চলেছেন ব্যালের ছন্দে। ধারাভাষ্যকাররা এমনই ব্যাখ্যা করেছেন দিয়েগোকে। তাঁর আগে বা পরে এমন খেলোয়াড় হয়তো আর আসেননি। পিটার শিলটন বারবার প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন মারাদোনার বিরুদ্ধে। কিন্তু ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, বছরের পর বছর প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের লাথি আর আঘাতের চাইতে অনেক বেশি প্রতারণা করা হয়েছে মারাদোনার সঙ্গে। হয়তো এজন্যই মারাদোনার সমব্যাথী হয়েছে দুনিয়া।

মারাদোনার কুখ্যাত জীবনযাত্রা সত্ত্বেও কেন দুনিয়াজুড়ে এত মানুষ এখনও তাঁকে স্মরণ করে, এত ভালোবাসে? এই প্রশ্নের উত্তরও অনেকটা অস্পষ্ট। আসলে, ওই যে বললাম, নিখুঁত সব মানুষকে হয়তো সম্মান করা যায়, তাঁরা যেন ভিনগ্রহের প্রাণী। কিন্তু ভালোবাসা হল অন্য অনুভূতি। কোনও খেলোয়াড়কে জনগণের ভালোবাসা পেতে হলে তাঁর চরিত্র বা জীবনয়াত্রাকে সুভদ্র হতে হবে, তেমন কোনও কথা নেই। ড্রাগ কিংবা অ্যালকোহলে আসক্তি থাকলেই যে কোনও খেলোয়াড় জনপ্রিয়তা হারাবেন, তেমনও নয়। সক্রেটিসের মতো খেলোয়াড় তাঁর নিজের দেশ ব্রাজিলে যথেষ্ট জনপ্রিয়। মারাদোনার ক্ষেত্রে এই জনপ্রিয়তার বিস্তার দুনিয়াজুড়ে। মারাদোনা কেবল তাঁর জেতা ট্রফিগুলির কারণেই আইকন হয়ে ওঠেননি, হয়েছেন তাঁর খেলার স্টাইলের জন্য, অদম্য জয়ে ইচ্ছাশক্তির কারণে, তাঁর দুর্দমনীয় সত্তায় তিনি যে ম্যাজিক তৈরি করেছেন, তার আবেশে। সেই মায়া যেন মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে জনতাকে। অন্তত আজ যারা চল্লিশোর্ধ্ব, তাঁদের তো বটেই। ১৯৮৬ বা তার আশপাশে নিজের সেরা ফর্মে খেলার মাঠে প্রতিপক্ষকে নিয়ে যেভাবে ছেলেখেলা করেছেন মারাদোনা, অন্য যে কোনও খেলোয়াড়ের পক্ষে তার পুনরাবৃত্তি করা কঠিন। এক দৌড়ে সাতজনকে কাটিয়ে গোল করা আজকের খেলোয়াড়দের পক্ষে প্রায় অসম্ভবই। আচ্ছা, এত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দুনিয়ার কোটি কোটি জনগণের মনে দিয়েগো মারাদোনার জাদুময় উপস্থিতির ব্যাখ্যাটা কি সত্যিই সম্পূর্ণ হল? বোধহয়, না। সবকিছু ছাপিয়ে কোথায় যেন রয়েছে দিয়েগো মারাদোনার এক এক্স-ফ্যাক্টরের অনিবার্য উপস্থিতি যাকে উপলব্ধি করা গেলেও বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। হ্যারি পটারের ম্যাজিকের মতো তা যেন সত্যি সত্যিই ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে।

(লেখক কলকাতা ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের রাশিবিজ্ঞানের অধ্যাপক)