করোনা আবহে খেতি লক্ষ্মীপুজোয় মাতল উত্তরবঙ্গের রাজবংশীরা

439

সুভাষ বর্মন, শালকুমারহাট: উত্তরবঙ্গে রাজবংশী ক্ষত্রিয় সমাজে লক্ষ্মীপুজো হয় একটু অন্যভাবে। কোজাগরি পূর্ণিমায় কিংবা আশ্বিন মাসের সংক্রান্তিতে রাজবংশী ক্ষত্রিয় সমাজে যে পুজো হয় তা ‘খেতি লক্ষ্মীপুজো’ নামে পরিচিত। খেতি লক্ষ্মী হলেন শস্যের দেবী। জমিতে ভালো ফলনের কামনাতেই একসময় ঘটা করে রাজবংশী জমিদার, জোতদারদের বাড়িতে ‘খেতি লক্ষ্মীপুজো’ হত।
তবে এখন জমিদার নেই, সাধারণ কৃষকদের বাড়িতেও আগের মতো ঘটা করে খেতি লক্ষ্মীপুজোর সংখ্যা দিনদিন কমছে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে এই পুজোয় এবার কোনও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। কারণ,ঘরোয়াভাবেই এই পুজো হয়। তাই রাজবংশী সম্প্রদায়ের কৃষকদের অধিকাংশই ঘটা করে না হলেও সংস্কৃতিকে আগলে রেখে নিয়মনিষ্টা মেনে ‘খেতি লক্ষ্মীপুজোর’ প্রস্তুতি নিয়েছেন।

পুজোর দিন ভোরবেলা থেকেই বাড়ির বধূরা ঘর, উঠোন পরিস্কার করে লেপামোছা করেন। উঠোনে গোবর জল ছিটিয়ে দেন। পুরুষরা কলাপাতা, দুর্বাঘাস, বেলপাতা, তুলসীপাতা ও ফুল সংগ্রহের কাজে লেগে যান। বাড়ির বাইরে টিন,খড় বা পাটকাঠির একচালা দিয়ে মন্ডপ তৈরি করা হয়। মন্ডপের তিনদিকে বেড়া দেওয়া থাকলেও একদিক খোলা থাকে। এরপর বাড়ির সবাই স্নান করে খেতি লক্ষ্মীপুজোর বিভিন্ন সামগ্রী সাজানো শুরু করেন। এই পুজোয় কোনও মূর্তি ব্যবহার করা হয় না। পুজোয় অধিকারি বা পুরোহিতদের ভূমিকাই প্রধান।

- Advertisement -

লক্ষ্মীর পাশাপাশি শিব, দুর্গা, কালী, কৃষ্ণ ও বলরাম পূজিত হন। মন্ডপ তৈরির পর সেখানে খেত থেকে গোড়া সহ একাধিক ধান গাছের থোপ এনে খাড়া করে রাখা হয়। ধান গাছের এই থোপকে ‘গয়’ বলা হয়। যেহেতু এই পুজোয় কোনও মূর্তি থাকে না,তাই গয়কেই দেবীর প্রতিনিধি হিসেবে ধরা হয়। পুজোর সময় কৃষকদের বাড়ির উন্নতি,বিশেষত ধানের গোলার পূর্ণতার জন্য দেবীর কাছে প্রার্থনা করা হয়। সন্ধ্যার আগে সবাই প্রসাদ গ্রহণ করে উপোস ভাঙেন। রাজবংশী পরিবারে এইদিন সাধারণত নিরামিষই রান্না হয়ে থাকে।

পুজোমন্ডপে ভোগ রান্নার পাশাপাশি বাড়িতে অন্যান্য অনুষ্টানের আয়োজনও চলতে থাকে। মহিলারা বাতাবিলেবুর পাতা কড়াইতে ভেজে ছাম গাইনে খইল দিয়ে গুঁড়ো করে নেন। এই মিশ্রিত পদার্থটিকে বলা হয় ‘দল’। আবার কেউ একই সময়ে সলতে তৈরি করে তা সরষের তেলে ভিজিয়ে রাখেন। প্রসাদ খাওয়া শেষ হলে সবাই ‘দল’ ও সলতে গ্রহণ করেন। এরপর পুজোমন্ডপে ‘গয়’ বা ধানের স্তোবকগুলি রোপণ করা হয়। অন্যদিকে ‘দল’গুলি ধানখেতে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। সন্ধ্যাবেলায় প্রতিটি ঘরের দরজার কাছে, বাস্তুঠাকুরের থানে এবং বাইরের দেবতার স্থানগুলিতেও সলতে দিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়। কেউ কেউ আবার এই রাতে আকাশপ্রদীপও জ্বালিয়ে দেন। এই ব্যতিক্রমী নিয়মেই রাজবংশী ক্ষত্রিয় সমাজে লক্ষ্মীপুজো হয়।