চোখে জল নিয়ে ভিটেমাটি ছাড়বেন ভুটিয়াবস্তির প্রবীণরা

112

রাজু সাহা, শামুকতলা : প্রকৃতি তাঁদের জীবনজুড়ে। বনজঙ্গল, পশুপাখির সান্নিধ্য ছাড়া তাঁদের পক্ষে বেঁচে থাকাই কঠিন। অথচ সেই বনবস্তি ছেড়ে যেতে হবে। আলিপুরদুয়ার জেলার কুমারগ্রাম ব্লকের ভুটিয়াবস্তির দঙ্গরবাহাদুর ছেত্রী, মনশয়া সোনার, সোনু গোড়, ভাগীরথী মঙ্গর, রামবাহাদুর মঙ্গরদের মতো প্রবীণরা মনের গভীরে এক প্রবল শূন্যতা নিয়ে বনবাসী জীবন ছেড়ে নগরজীবনে যেতে নিমরাজি হচ্ছেন। আবার নতুন প্রজন্মের ক্ষেত্রে ছবিটা উলটো। বিক্রম মঙ্গর, সুস্মিতা কুমাল, আকাশ মাঝি-রা আধুনিক জীবনের হাতছানিতে খুশিমনেই শহরে যেতে চাইছেন।

বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের কোর এরিয়ায় ভুটিয়াবস্তি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কোর এরিয়ার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সরকারি তোড়জোড় চলছে। এক দশক আগে বেশ কিছু বাসিন্দাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। এখনও এই বস্তিতে ৫২টি পরিবারে ১০১ জন বাসিন্দা রয়েছেন। বক্সার জঙ্গলে আরও বাঘ ছাড়া হবে। এই কারণে ওই বস্তির বাকি ৫২টি পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেয় বন দপ্তর। এর জন্য বন দপ্তর ভুটিয়াবস্তির বাসিন্দাদের জন্য পুনর্বাসন প্যাকেজও ঘোষণা করে। সরকারি প্রস্তাব মেনে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করা ভুটিয়াবস্তির বাসিন্দারা ভিটেমাটি ছেড়ে নগরজীবনে যেতে রাজি হয়েছেন।

- Advertisement -

ভুটিয়াবস্তিতে জন্ম দঙ্গরবাহাদুর সোনারের। তাঁর এখন বয়স ৭০। দঙ্গরবাহাদুরের কথায়, এই বস্তিতেই জন্ম, এখানেই আমার বড় হয়ে ওঠা। তাই বস্তির প্রতি বড় মায়া আছে। এই বনজঙ্গল, গাছপালা, পশুপাখিরা আমাদের আপনজন। হাতি এলেও ওদের ‘বাবু হটো, বাবু হটো’ বললেই চলে যায়। ওরা যেন আমাদের কথা বোঝে। এবার ওদের ছেড়ে যেতে হবে। দঙ্গরবাহাদুরের স্ত্রী মনশয়া সোনার ৫০ বছর আগে বিবাহসূত্রে এই বস্তিতে আসেন। বস্তি ছেড়ে যেতে কষ্ট হবে, জানালেন তিনিও।

নগরজীবনে গিয়ে কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন? উত্তরে রামবাহাদুর মঙ্গর বললেন, ভাবতেই চোখে জল আসছে। গাছপালার ছায়া, শীতল বাতাস, পশুপাখির ডাক, এই মনোরম দৃশ্য আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাবে। এই শূন্যতা কোনওভাবেই পূরণ হবে না। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কথা ভেবেই আমরা অন্যত্র যেতে রাজি হয়েছি। ভুটিয়াবস্তির পঞ্চায়েত সদস্য সাজেন সোনারের পর্যবেক্ষণ, প্রবীণদের এখান থেকে যেতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তাঁরাও ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভিটেমাটি ছাড়বেন। দুর্গম এলাকায় থাকায় আমরা আধুনিক জীবনের সমস্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই সবাই অন্যত্র যেতে রাজি হয়েছেন।

ভুটিয়াবস্তির নতুন প্রজন্মের বিক্রম মঙ্গর, শম্ভু মঙ্গর, আকাশ মাঝি, সুস্মিতা কুমাল-রা জানান, এই দুর্গম এলাকায় থেকে পড়াশোনা করাও কঠিন। তাছাড়া কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে ৩০ কিমি গভীর ঘন জঙ্গল পেরিয়ে জেলা হাসপাতালে যেতে হয়। তাই এখান থেকে অন্যত্র যেতে চান নবীনরা। পুনর্বাসনের জন্য একেকটি পরিবারকে ১৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব হয়েছে। তবে টাকা কীভাবে দেওয়া হবে সেটা নিয়ে ধন্দে বনবস্তিবাসী। তাঁরা সরাসরি অ্যাকাউন্টে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।