ফ্যাক্টরির সুপারভাইজার এখন সবজি বিক্রি করেন ময়নাগুড়িতে

142

বাণীব্রত চক্রবর্তী, ময়নাগুড়ি : পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ১৮ বছর আগে পাড়ি দিয়েছিলেন মুম্বই। এরপর থেকে টানা এতগুলি বছর মুম্বই, গুজরাট ও দিল্লিতে প্লাইউড ফ্যাক্টরির সুপারভাইজারের দায়িত্ব সামলেছেন ময়নাগুড়ির তপন মোদক। কিন্তু, গত বছরের লকডাউন জীবনটা বদলে দিয়েছে তাঁর। সেসময় পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ঘরে ফিরে এসেছিলেন। গাঁটের টাকাও খরচ হয়ে গিয়েছে।  জোটেনি নতুন কাজও। তাই সংসার চালাতে এখন ময়নাগুড়িতেই সবজি বিক্রি করছেন তিনি।

ছোটবেলার এক গৃহশিক্ষকের দেওয়া জীবনযুদ্ধে লড়াইয়ের কথাটি যেন আজও মনে নিয়ে সাইকেল নিয়ে সবজি বিক্রি করতে ছোটেন শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। ময়নাগুড়ির টেকাটুলির মোদকপাড়ার বাসিন্দা তপন মোদক। সাইকেল নিয়ে ময়নাগুড়ি বাজার সহ বিভিন্ন হাটে সবজি বিক্রি করেন। সুপারভাইজারের কাজের বদলে সবজি বিক্রেতা হিসেবে প্রথম দিকে নিজেকে বড় বেমানান মনে হচ্ছিল তাঁর। তারপর কিছু ক্রেতাদের সঙ্গে পরিচয় এবং কথাবার্তায় একটা সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এখন এই কাজে বেশ মন লাগিয়েছেন তিনি।

- Advertisement -

বৃদ্ধ বাবা তারাপদ মোদক এখন তেমন কাজ করতে পারেন না। গতবছর লকডাউনের শুরুতে পুত্র ময়ূখের জন্ম হয়। গত ১ বছরের ছোট্ট ছেলেটিকে দাদু আদর করে ডাকেন লকডাউন। কথাটার অর্থ বোঝে না ময়ূখ। কিন্তু তপন মোদক হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন লকডাউন অর্থ কী। প্রায় ১৮ বছর আগে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে পরিবারের খরচ চালাতে পাড়ি দেন মুম্বই। তাঁর সঙ্গীসাথিরা বেশিরভাগ ফের পাড়ি দিয়েছেন ভিনরাজ্যে। কিন্তু, মা কণিকা মোদক ও স্ত্রীর কথা রেখে আর সেই পথ মাড়াননি তিনি।

জল্পেশ বাজারে রবিবার এবং বুধবার সাপ্তাহিক হাট বসে। সেই বাজারে সবজি বিক্রি করেন। ময়নাগুড়ি নতুন বাজারে শুক্রবার এবং মঙ্গলবার সাপ্তাহিক হাটে সবজি নিয়ে বসেন। এছাড়াও প্রতিদিন নিয়মিত ময়নাগুড়ি বাজারে বসেন। বাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করেন। এভাবেই কঠোর পরিশ্রম করে চলছেন গত টানা ছয়মাস ধরে।

তপনের বক্তব্য, লকডাউনের পর বাড়ি ফিরে এসে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। এত বছরের জমানো টাকা সংসার চালাতে সমস্তটাই খরচ হয়ে গিয়েছিল। ভাবলাম অনেকেই নতুন করে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে। আমিও ফের আমার সেই গন্তব্যে যাই। ফোনে যোগাযোগ ও করে ফেলেছিলাম। কিন্তু পরিবার তাতে রাজি হয়নি। তপনের স্ত্রী জ্যোতিকণাদেবী বলেন, আবার করোনা পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। এখন ভিনরাজ্যে যাবার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। সহমত পোষণ করেছেন তপনের বাবা তারাপদবাবুও। তাই তপনকে বেছে নিতে হয়েছে রোজগারের বিকল্প পথ।

গত বছর লকডাউনের ফলে ময়নাগুড়ি ব্লকে ফিরে আসা পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। ময়নাগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি শিবম রায়বসুনিয়া বলেন, সকলেই নিজস্ব এলাকায় যাতে ১০০ দিনের কাজে অগ্রাধিকার পান সেদিকে নজর রাখা হয়েছে। ময়নাগুড়ি-১ ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের সহ সভাপতি গোবিন্দ পাল বলেন, লকডাউন একটা বড় ধরনের বিপর্যয়। এখন পরিস্থিতি যে খুব ভালো তা কিন্তু নয়। সকলকে আরও অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।