বিশেষ অধিবেশন ডেকে প্রত্যাহার করা হোক কৃষি আইন, দাবি কৃষকদের

592
ছবি: সংগৃহীত

প্রসেনজিৎ দাসগুপ্ত, নয়াদিল্লী: কৃষক আন্দোলনের সমাধান খুঁজতে বৃহস্পতিবার আবারও বৈঠকে বসছে আন্দোলনকারী কৃষক ও কেন্দ্রীয় শিবির। কিন্তু তার আগেই এইদিন বিক্ষুব্ধ কৃষকদের তরফে রাখা হল মোক্ষম দাবি। জানিয়ে দেওয়া হল বিশেষ অধিবেশন ডেকে প্রত্যাহার করা হোক এই আইন। তা না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজধানী অবরূদ্ধ করে চলবে এই আন্দোলন।

বুধবার দিল্লিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ‘ক্রান্তিকারি কিষান ইউনিয়ন’-এর সভাপতি দর্শন পাল জানান, ‘কৃষক আন্দোলন থামাতে হলে একটাই পন্থা। সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে এই বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহার করুক কেন্দ্র।‘

- Advertisement -

দর্শন বলেন, ‘সরকারের সাথে এই তিনটি আইন নিয়ে আর কোনো বিচার বিশ্লেষণে যেতে রাজি নয় কৃষকরা। ইতিমধ্যেই কৃষকদের তরফে এই তিনটি আইনের বিরোধিতায় দশ পাতার স্মারকলিপি কেন্দ্রের কাছে দেওয়া হয়েছে। সেখানে যা বলার তা বিস্তারিত ভাবে জানিয়েছে কৃষকরা। বিতর্কিত তিনটি আইনের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ছাড়া আর কোন দাবি নেই কৃষকদের।‘

এইদিন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বিভাজনের রাজনীতি করার অভিযোগও এনেছে কৃষক সংগঠনিগুলি। আন্দোলনকারীদের পক্ষে দর্শন পাল বলেন, ‘সরকার কৃষক আন্দোলনে বিভাজন আনতে চায়। কৃষকদের বিভ্রান্ত করার ষড়যন্ত্র করছে কেন্দ্র। কিন্তু আমরা তা হতে দেব না।‘

দর্শন জানান, বিক্ষুব্ধ কৃষকরা সকলে সংযুক্ত কিষান মোর্চার নেতৃত্বে ঐক্যমত্য হয়ে আন্দোলনে নেমেছে। এটা শুধু পঞ্জাব বা হরিয়ানার কৃষকদের স্বার্থে আন্দোলন নয়। এই আন্দোলন সমস্ত দেশ জুড়ে কৃষক সমাজের। দর্শন পাল হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেন, অবিলম্বে এই আইন ভেঙে না দিলে দিল্লির সীমান্তে আন্দোলন আরও জোরদার হবে, অবরূদ্ধ হয়ে পড়বে গোটা দিল্লি। তাই যা কিছু সিদ্ধান্ত তা দ্রুত নিতে হবে কেন্দ্রীয় সরকার-কে, জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

কৃষক আন্দোলনের প্রথম পর্বে জলকামান, লাঠি চার্জ, টিয়ারগ্যাস ও ব্যারিকেড বসিয়ে কৃষক বনাম পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনা পেরিয়ে দিল্লি জুড়ে এখন শুধুই দফায় দফায় বৈঠক। কখনো বিজ্ঞান ভবন, কখনো কৃষি ভবন, কখনও বা বিজেপি সভাপতি বাসস্থান। গত ৭২ ঘন্টায় দিল্লিতে বারবার বৈঠকে মুখোমুখি হয়েছে কৃষক আন্দোলনকারী ও সরকার পক্ষ। কিন্তু প্রতিবারই তা নিস্ফলা প্রমাণিত হয়েছে। সরকারের কোনও প্রতিশ্রুতি’তেই ভোলেনি কৃষক সংগঠনগুলি। এই সঙ্কটজনক পরিস্থিতির হাল ধরতে রাজনাথ সিং, অমিত শাহ, জেপি নাড্ডা, কৃষি মন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমর তথা একাধিক শীর্ষ কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিকে রণাঙ্গনে নামিয়েছে কেন্দ্র৷ কিন্তু বিস্তর চেষ্টা করা সত্ত্বেও কৃষকদের ভরসা জিততে পারেননি তারা। এদিকে কৃষক আন্দোলনের জেরে গত সাতদিন ধরে অবরূদ্ধ হয়ে রয়েছে দিল্লি। দিল্লি সীমান্তের বিভিন্ন ‘এন্ট্রি পয়েন্টে’র দখল নিয়েছে কৃষকরা। প্রতিদিন বাড়ছে তাদের সংখ্যা। হাজার হাজার কৃষকদের ভিড়ে ক্রমশ নাভিশ্বাস উঠতে চলেছে রাজধানীর। আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব – এই নীতিতে ভর করে এখনও বিক্ষুব্ধ কৃষকদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে মোদি সরকার। কিন্তু আন্দোলন প্রশমিত হওয়ার কোনও লক্ষন দেখা যাচ্ছে না এখনও।

বুধবারেও তিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমর, পীযুষ গয়েল ও সোমপ্রকাশের সাথে আলোচনায় বসেছিল ৩৫ জন কৃষক। কিন্তু লাগাতার তিন ঘন্টার ম্যারাথন বৈঠকের পরেও বেরোয়নি সমাধান সূত্র। কেন্দ্রের তরফে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব রাখা হলে তা খারিজ করে দেন আন্দোলনকারীরা। তারা বলেন, এখন কমিটি গঠন করার যুক্তি নেই। সময় থাকতে আগেই তা করা উচিত ছিল কেন্দ্রের। কিন্তু তখন তা গ্রাহ্য করেনি সরকার। আগামীকাল ফের এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে কৃষকদের সাথে বৈঠকে বসতে চলেছে কেন্দ্র। যদিও কৃষকরা কৃষি আইন লোপ করা নিয়ে তাদের পূর্ববর্তী দাবিতেই অনড় রয়েছেন।

কৃষি আইন প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে হুমকি দেয় কৃষকরা৷ বুধবারের বৈঠকে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের মাধ্যমে কৃষক সমস্যার সমাধান খুঁজতে উদ্যোগী হন কৃষি মন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমর৷ কৃষক সংগঠনের তরফে কারা কারা তাতে থাকবেন তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। তোমর বলেছিলেন, এই কমিটিতে একটি ৫ সদস্যের ছোট দল কৃষকদের প্রতিনিধিত্ব করুক। কিন্তু সেই প্রস্তাব খারিজ করে কৃষকরা। কেন্দ্র চায় আন্দোলন প্রত্যাহার করে আলোচনায় বসুক কৃষকরা৷ আগামীকাল আবারও বৈঠকে বসবে কেন্দ্র৷ তবে সবকিছুই নির্ভর করছে বিক্ষুব্ধ কৃষকদের উপর৷

এদিন বৈঠকের পর ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের প্রধান রূপ সিং বলেন, ‘কমিটি গঠন করে কৃষক আন্দোলনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখতে চায় কেন্দ্র৷ এর আগেও ১৩ নভেম্বর একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়। আমরা তা মানিনি। এদিন সেই আর্জি আবারও ফিরিয়ে দেওয়া হয়৷ আমাদের দাবি একটাই-তিনটি কেন্দ্রীয় আইনের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। তা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন জারি থাকবে।’

এই বৈঠকের পরেই সাংবাদিক সম্মেলনে বসে বিক্ষুব্ধ কৃষক ইউনিয়নের সভাপতি দর্শন পাল বিশেষ অধিবেশন ডেকে কেন্দ্রীয় আইন প্রত্যাহারের ডাক দেন। অল ইন্ডিয়া কিষান সভার তরফে জানানো হয়েছে বৃহস্পতিবার সকালে সমস্ত কৃষক ইউনিয়ন একত্রে বৈঠকে বসে তাদের রণনীতি চূড়ান্ত করবে। তারপর কেন্দ্রের সাথে আলোচনায় বসবে তারা। যতদিন না সমস্যার আশু সমাধান হচ্ছে ততদিন আন্দোলন ও আলোচনা একত্রে জারি রাখবে কৃষকরা। দেখার বিষয় বৃহস্পতিবার কৃষক-কেন্দ্র বৈঠকে কোনও ইতিবাচক দিক উঠে আসে কিনা। তবে পর্যবেক্ষক মহলের দাবি, আগামীকাল কেন্দ্রের কাছে বিশেষ অধিবেশন ডেকে কেন্দ্রীয় আইন প্রত্যাহারের দাবিতেই অনড় থাকবেন কৃষকরা।