আফিম যুদ্ধের পর নেশার জালে জড়িয়ে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ

312

অতনু বিশ্বাস

আমরা যারা কাবুলিওয়ালার সঙ্গে মিনির স্নেহের রসায়নের রসে সিক্ত হবার সুযোগ পেয়েছি ছেলেবেলা থেকে, তাদের মনের কোণে একটা ধারণা থাকা সম্ভব। আফগানিস্তানের ঊষর পার্বত্য মরুদেশের প্রধান রপ্তানিযোগ্য কৃষিজ বস্তু বাদাম, কিশমিশ। গত চার দশকের ছবিটা কিন্তু একেবারেই আলাদা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আফিমের জাল কিন্তু আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে দেশটাকে। দেশটার সমাজ, অর্থনীতি, এমনকি এই দ্বিতীয় পর্যায়ে তালিবান শাসনের শিকড়ও খুঁজে পাওয়া যাবে আফিম চাষের মধ্যে।

- Advertisement -

একশো বছর আগেকার আফগান সমাজের যে ছবি এঁকেছেন সৈয়দ মুজতবা আলি তাঁর দেশে বিদেশে বইতে, সেখানে মাদকের মায়াজালের এই ছবিটা পাওয়া যাবে না। গত শতক ধরেই চাষ হলেও আফগানিস্তানে আফিমের রমরমা শুরু আটের দশক থেকে। গৃহযুদ্ধ, সন্নিকটস্থ ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি, তালিবানের উত্থান, এসব কিছুরই যোগসূত্র মিলবে আফিমের সঙ্গে। ১৯৮৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের আফিম চাষের পরিমাণ প্রতি বছর বেড়েছে ২৩ শতাংশ করে। পরবর্তীকালে, এমনকি অতিমারির মাঝেও ২০২০-তে তা বেড়েছে ৩৭ শতাংশ।

নয়ের দশকেই আফগানিস্তান হয়ে দাঁড়ায় পৃথিবীর প্রধানতম বেআইনি আফিম উৎপাদক রাষ্ট্র। ১৯৯৯ সাল নাগাদই পৃথিবীর ৭৯ শতাংশ বেআইনি আফিম উৎপন্ন হত সেখানে। আজকের দিনে বিশ্বের ৯০ শতাংশ হেরোইন তৈরি হয় আফগান আফিম দিয়ে।

এই যে বিপুল বেআইনি মাদক- দেশটার সমাজ ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবেই। রাজনীতিতেও। বাস্তবে এই প্রভাবটা সাংঘাতিক। বহু মানুষ যে মাদকাসক্ত তাই নয়, দেশটার আজকের শোচনীয় দুর্দশার শিকড় খুঁজতে গেলেও আমরা পৌঁছে যাব ওই বেআইনি মাদকের দোরগোড়ায়।

আফগানিস্তানের মাদক ব্যবসার, বাণিজ্যের প্রবল প্রভাবের এক অসাধারণ বর্ণনা দিয়েছিলেন আফগান-আমেরিকান সাংবাদিক ফারিবা নাওয়া, তাঁর ২০১১-র বই ওপিয়াম নেশন : চাইল্ড ব্রাইডস, ড্রাগ লর্ডস, অ্যান্ড ওয়ান উইমেন্স জার্নি থ্রু আফগানিস্তানে। এই বেআইনি মাদক ইন্ডাস্ট্রির মূল্য দেশের ভিতরেই ৪ বিলিয়ন ডলার আর দেশের গণ্ডির বাইরে ৬৫ বিলিয়ন ডলার। দেশটার জিডিপির ৬০ শতাংশই আসে আফিম থেকে। অজস্র মানুষ, পরিবার জীবিকার জন্য নির্ভর করে আছে আফিমের উপর। আফিম চাষে, শোধন কার্যে, চোরাচালানে। বাস্তবে আজ অন্য কোনও কিছুই এমন বিপুলভাবে আম-আফগানের দৈনন্দিন জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে না। মাদকের এক অচ্ছেদ্য নিবিড় নাগপাশ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে দেশটাকে, তার বেঁচে থাকাকে, তার জীবনধারাকে, তার ভবিষ্যৎকে।

আফিমচাষিরা দাদন নেয় ধনী ড্রাগ মাফিয়াদের কাছ থেকে। ফসলের উৎপাদন ঠিকমতো না হলে চাষিদের সর্বনাশ। ড্রাগ মাফিয়াদের কাছ থেকে রক্ষা পেতে এমনকি বাড়ির ছোট মেয়েদেরও দিয়ে দিতে বাধ্য হয় তারা। এদের বলে ওপিয়াম ব্রাইড। ফারিবা নাওয়া তাঁর বইতে দারিয়া নামে ১২ বছরের এমনই এক আফিম কনের কথা বলেছেন।

তালিবানের বাড়বাড়ন্তের পিছনেও আফিম। তালিবানের অর্থের জোগানের সবচেয়ে বড় পথ। আমেরিকা পশ্চিমি দুনিয়া তা কিন্তু জানে। প্রথম তালিবান জমানার অন্তে আফগান যুদ্ধের সময় তারা বারবার চেষ্টা করেছে এই আফিমের চক্র ভাঙতে। বারাক ওবামা থেকে হামিদ কারজাই, সকলেই বলেছেন যে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা, উন্নতি এবং সুস্থিতির প্রধান অন্তরায় আফিম। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের রোজগারের বিকল্প ব্যবস্থা না করে এই বেআইনি আফিম উত্পাদন বন্ধ করা ভীষণ কঠিন, প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ভুক্ত। অথচ বিকল্প ব্যবস্থা করতে কৃষি এবং শিল্পক্ষেত্রে যে পরিমাণ বিনিযোগ করার প্রয়োজন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তা হয়নি। উলটে সরকারের এবং আমেরিকান বাহিনীর আফিম নির্মূল করার কর্মপদ্ধতি দেশের আফিম-নির্ভর সাধারণ মানুষকে সমস্যাতেই ফেলেছে। বিপদেই পড়েছে অগ্রিম দাদন নিয়ে ফেলা আফিমচাষিরা।

সেসময়ে মার্কিন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে গভীর আলোচনা হয়েছে, কীভাবে রোখা যায় এই বেআইনি আফিম। বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছে আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেট। ২০০৬-০৭ নাগাদ। আফগান আফিমকে বৈধতা দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল। ওষুধ তৈরিতে তা ব্যবহার করা যেত ইউরোপ এবং আমেরিকার ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে।

ঘটনা হল, বৈধ আফিমের দাম আফগান আফিমের উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। আর এত বিপুল পরিমাণ বৈধ আফিমের চাহিদা সত্যিই হয়তো নেই। তাই সাত-পাঁচ ভেবে আফগান আফিমকে বৈধ করার পথে হাঁটল না আমেরিকা। অনেকে এমন বলেছিলেন, এই উত্পাদিত আফিম চাষিদের কাছে ন্যায্যমূল্যে কিনে নিক আমেরিকা। যতটা ওষুধ শিল্পে লাগবে লাগুক, বাকিটা নষ্ট করে ফেলা হোক। আসলে সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা না দিতে পারলে জনসমর্থন পাওয়া যায় না কিছুতেই। এভাবে তালিবানের অর্থের জোগানের সূত্র কেটে দেওয়ার চেষ্টা করা যেত। আমেরিকা অবশ্য সরাসরি চেষ্টা করল আফিম উৎপাদন বন্ধে। কিন্তু বাস্তবে হাজার চেষ্টা করেও বেআইনি আফগান আফিম উৎপাদন থামানো গেল না। সেখানেই আফগান যুদ্ধটা হেরে বসেছে আমেরিকা। ২০০১ থেকে যে যুদ্ধে গড়ে প্রতিদিন তারা খরচ করেছে ১৫ লক্ষ ডলার।

এই যুদ্ধটাকেই অনেকে বলেন আফিম যুদ্ধ। ২০১০ নাগাদই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আফগান আফিম উৎপাদন থামাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। শেষ চেষ্টা হয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে। ২০১৭-র নভেম্বরে আমেরিকা শুরু করে বিমান আক্রমণ, তালিবানের ড্রাগের পরিকাঠামোর উপর। আফিম এবং তা থেকে হেরোইনের মতো মাদক তৈরির ল্যাব, শোধনাগার, ইত্যাদিকে গুঁড়িয়ে দিতে। প্রকল্পের নাম ছিল আয়রন টেমপেস্ট। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, তালিবানের টাকার জোগানে আঘাত করা। তালিবানের অর্থের পাঁচ ভাগের তিন ভাগই যে আসে ড্রাগ ব্যবসা থেকে। বছরে ২০ কোটি ডলার। কিন্তু কয়েকশো মার্কিন বোমার আঘাতেও ভাঙা যায়নি এই বিপুল পরিকাঠামো এবং এর মাঝেই কোনও এক অজানা কারণে আক্রমণ থামিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন শান্তি আলোচনায় বসে গেল তালিবানের সঙ্গে।

যাই হোক, আফগানিস্তানে আমেরিকা এবং ন্যাটো যে যুদ্ধটা হেরেছে তা আসলে আফিম যুদ্ধ। আফিমে ভর করেই দ্বিতীয়বার আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করেছে তালিবান। ক্ষমতা দখল করেই তালিবান ঘোষণা করেছে যে তারা বেআইনি আফিমের ব্যবসা চলতে দেবে না। কিন্তু এর ফলে তালিবানের অর্থের জোগানের কী হবে? বিশেষ করে পশ্চিমি অনুদান বন্ধ হবার ফলে তালিবান শাসকদের হাতে অর্থের সমূহ অভাব এবং দেশের মানুষের বিকল্প আয়ে উৎস কী হবে, সেটাও পরিষ্কার নয়।

মাদক আটকাবার এই ঘোষণা যে এই তালিবান শাসকদের আন্তর্জাতিক মহলের সুনজরে আসার একটা প্রচেষ্টা, সে বিষয়ে সন্দেহ কম। তাই এই ঘোষণায় তালিবান কতটা আন্তরিক, সেটা এখনই বলা কঠিন বৈকি। ৯ বিলিয়ন ডলার খরচ করে আমেরিকা যা করতে পারেনি দুদশকে, সেই ম্যাজিক কি ঘটবে সত্যিই? কিন্তু কীভাবে? এবং এর ফলশ্রুতিতে এক বিপুল সংখ্যক মানুষের রোজগারে টান পড়লে কীভাবে সামলাবে তালিবান?

একে তো তালিবান জমানা আফগানিস্তান দেশটাকে ঠেলে দিতে চলেছে মধ্যযুগে। সেইসঙ্গে দেশটার সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ধারিত হয়ে চলেছে বেআইনি আফিমের গতিপ্রকৃতি দ্বারা। অদূরভবিষ্যতে রহমতদের জীবনপ্রবাহ কীভাবে প্রবাহিত হবে, পুরোটাই তাই অনিশ্চিত।

(লেখক ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতার রাশিবিজ্ঞানের অধ্যাপক)