রাজ্যে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে

414

কলকাতা : স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প নিয়ে রাজ্য সরকারের গর্বের শেষ নেই। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালগুলির বক্তব্যে প্রকল্পের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠে এল। বেসরকারি মালিকানাধীন হাসপাতালগুলি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বিভিন্ন রোগে ওই প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থে চিকিৎসা করা কার্যত অসম্ভব। সোমবার অ্যাসোসিয়েশন অফ হসপিটালস অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার প্রতিনিধিরা স্বাস্থ্য ভবনে রাজ্যের শীর্ষ স্বাস্থ্যকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা বিচ্ছিন্নভাবে এই প্রকল্প নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ তুলেছিলেন। এতদিন রাজ্য সরকারকে সরাসরি কিছু জানাননি। এদিনের বৈঠকে এই প্রতিনিধিরা বলেন, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে বেসরকারি হাসপাতালগুলির জন্য চিকিৎসার যে খরচ বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা অবাস্তব। বড় হাসপাতাল দূরে থাকুক, ছোটখাটো নার্সিংহোমগুলিও এই খরচে পোষাতে পারবে না। সংগঠনের সভাপতি রূপক বড়ুয়া বলেন, আমাদের চিকিৎসা দিতে প্রতি মুহূর্তে পরিকাঠামো উন্নয়ন করতে হচ্ছে। যন্ত্রপাতি এবং লোকসংখ্যার বিচারে আমাদের খরচ অনেক বেশি। সেই তুলনায় চিকিৎসায় সরকারের বরাদ্দ একেবারেই অবাস্তব। সরকারি টাকা পেতে দীর্ঘ সময় লাগাটাও বেসরকারি হাসপাতালগুলির মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে বেসরকারি হাসপাতালগুলির তরফে স্বাস্থ্যকর্তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তারা বেসরকারি হাসপাতালের বক্তব্য বিবেচনার আশ্বাস দিলেও জানিয়ে দিয়েছেন, কোনও রোগীকে কোনওভাবেই ফেরাতে পারবে না বেসরকারি হাসপাতাল। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, এ ব্যাপারে কড়া মনোভাব নিয়েছে রাজ্য সরকার।

রাজ্য সরকার রাজ্যের ১০ কোটি মানুষকেই স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাস্থ্যসাথী নামে এই প্রকল্পে পরিবারপিছু বছরে ৫ লক্ষ টাকার চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে। বহু মানুষের অভিযোগ, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড নিয়ে গেলে বেসরকারি হাসপাতালগুলি চিকিৎসা করতে অস্বীকার করছে। আমরি হাসপাতালের গ্রুপ সিইও রূপক বড়ুয়া বৈঠকের পরে বলেন, ক্লিনিক্যাল ও অপারেশনের ক্ষেত্রে আমরা মান নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যথেষ্ট চাপে থাকি। বেসরকারি হাসপাতালের কাছে মানুষের ব্যাপক প্রত্যাশা। সেই চাপ মাথায় নিয়ে সরকারি রেটে পরিষেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তবে স্বাস্থ্যকর্তারা খরচের বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। হাসপাতাল কর্তারা চিকিৎসার খরচের হার নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তাঁরা বলেন, ওই কমিটিতে যে আমাদের সদস্য থাকতে হবে, তার কোনও মানে নেই। সরকার কোনও বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে চিকিৎসার খরচ পুনর্বিবেচনা করুক। আমাদের একটাই দাবি, এই খরচ যেন বৈজ্ঞানিকভাবে ধার্য করা হয়। এদিনের বৈঠকে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আরও একটি বাস্তব সমস্যা তুলে ধরেন বেসরকারি হাসপাতাল কর্তারা। তাঁরা বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলি বেশিরভাগই সুপারস্পেশালিটি সুবিধাযুক্ত। এই হাসপাতালগুলি ছোটখাটো অসুস্থতার চিকিৎসার জায়গা নয় এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালগুলিতে উন্নত যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়। কাজেই যাঁদের এই ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন, শুধু তাঁদেরই যেন বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে রেফার করা হয়। কারণ এই হাসপাতালগুলিতে সাধারণ অসুস্থতা নিয়ে রোগীরা বেড দখল করে রাখলে জরুরি চিকিৎসার জন্য বেডের অভাব দেখা দেবে।

- Advertisement -

সরকারি টাকা পেতে মাসের পর মাস লেগে যাচ্ছে বলেও হাসপাতালের প্রতিনিধিরা স্বাস্থ্যকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানান। তাঁরা বলেন, এমনিতেই করোনাকালে হাসপাতালগুলি ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তার ওপর রাজ্য সরকার টাকা দিতে এত দেরি করলে বেসরকারি হাসপাতালগুলি চূড়ান্ত দুর্দশার মধ্যে পড়বে। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, বেসরকারি হাসপাতালগুলির দাবিদাওয়া নিয়ে রাজ্য সরকার অবশ্যই বিচার-বিবেচনা করবে। কিন্তু কোনওভাবেই স্বাস্থ্যসাথী কার্ড নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের ফেরানো বরদাস্ত করা হবে না। এ ব্যাপারে কঠোর মনোভাব নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।