সরকার নির্বিকার! ক্ষোভ বাড়ছে জিরো পয়েন্টের অধিবাসীদের মধ্যে

75

গঙ্গারামপুর: ভারত স্বাধীন হয়েছে ৪৭ বছর আগে। ১৯৭১ সালে গঠিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। এর বহু বছর পরে ভারত ও বাংলাদেশ দুই স্বাধীন দেশের সীমান্তে পড়েছে কাঁটাতারের বেড়া। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়ার ওই পাড়ে জিরো পয়েন্টে রয়ে গেছেন এখনও বহু ভারতীয়। নিজেদের তৈরি বাড়িঘর ছেড়ে কাঁটাতার পেড়িয়ে এপাড়ে অনেকে এলেও নতুন বাড়ি তৈরিতে সক্রিয় সহায়তা নেই প্রশাসনের। এমন ক্ষোভের কথা জানালেন গঙ্গারামপুর ব্লকের সুকদেবপুর পঞ্চায়েত এলাকার মল্লিকপুর গ্রামের বাসিন্দারা।

ভারত বাংলাদেশ ভাগ হলেও মল্লিকপুরের অমল রায়, সুধীর রায়, নলীনি রায়ের মত বহু মানুষ এখনও কাঁটাতারের ওপারে জিরো পয়েন্টে থেকে গিয়েছেন। কাঁটাতার দেবার আগে ও তারপরের যন্ত্রনা বাড়ছে। তাই অনেকেই নিজের বসত ভিটা ছেড়ে চলে এসেছেন ভারতের মধ্যে। কিন্তু মন পড়ে আছে কাঁটাতারের ওপারে। সত্তর ছুঁই ছুঁই জিতেন্দ্র নাথ রায় জানিয়েছেন কৃষি কাজ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তার সমস্ত জমি জিরো পয়েন্টে  বাংলাদেশের গা ঘেঁষে। চোখের সামনে দেখেছেন দেশভাগ। এরপর কাঁটাতার দেবার ফলে মল্লিকপুর গ্রামের প্রায় ৪৭ টি পরিবার থেকে যান জিরো পয়েন্টে। জিরো পয়েন্টে থাকার যন্ত্রণা অন্যরকম। প্রতিমুহূর্তে বিএসএফের চোখরাঙানি, শিক্ষা, চিকিৎসা সহ সমস্ত পরিষেবা পাবার সুযোগ মেলে অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে। ২০১৭ সালে বন্যার সময় অবশ্য বিএসএফের সহযোগিতার কথা মনে আছে গৌর রায়, সুমতি রায়দের। মনে আছে গতবছর করোনার সময় একটানা ৪৫ দিন ঘরবন্দী করে রেখেছিল বিএসএফ।

- Advertisement -

কাঁটাতারের মুখে ১ নম্বর গেট পাহারা দেয় বিএসএফ। আর গ্রামে তৈরি হয়েছে বিএসএফের ক্যাম্প। একেবারে জিরো পয়েন্টের ভেতরে। ওপাড়ে বাংলাদেশের কোতোয়ালি থানা। বোরো ধান লাগানো জমিতে জল দিতে গিয়ে কথা হয় ওপাড়ের মাসিদূরের সঙ্গে। তবে আলের ওপাড়ে দাঁড়িয়ে। দূর থেকে লক্ষ করে বিএসএফ আর বাংলাদেশের বিডিআর। কি কথা হয়েছে জেনে নেন বিএসএফের জওয়ান। ক্যাম্পের বিএসএফ কর্তা বদলি হলে এক থেকে দুই সপ্তাহ কোথাও যাবার উপায় নেই। সময়ের মধ্যে না গেলে স্কুল-কলেজ দূরের কথা নতুন জীবনের জন্য পা বাড়াবার উপায় নেই। গ্রামের আনন্দ রায় মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছিলেন। বিএসএফের বাধায় মেয়ের বিয়ে বন্ধ হয়নি। তবে নিজের বাড়ি ছেড়ে কাঁটাতার পার করে দূরে এক আত্মীয়র বাড়ি থেকে বিয়ে দিতে হয় মেয়ের। মল্লিকপুর গ্রামে জিরো পয়েন্টের ভেতরে প্রতিটি বাড়ি পাটকাঠির বেড়া দিয়ে তৈরি। অধিকাংশ বাড়িতে শৌচালয় নেই। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলেও পিছু নেয় বিএসএফ। সন্দেহ তাড়া করে ফেরে প্রতি পদক্ষেপে। সীমান্ত সুরক্ষার ক্ষেত্রে জিরো পয়েন্ট থেকে চলে যাবার কথা কখনো বলে না বিএসএফ।

তবে রোজকার জীবন যন্ত্রণার বাইরে জিরো পয়েন্টের ভেতরে থাকার যন্ত্রনা বাড়াতে থাকে বিএসএফ। যা হাড়ে হাড়ে টের পান জিরো পয়েন্টে থেকে যাওয়া এখনও ১৪টি পরিবার। মনে মনে ঠিক করে ফেলেছেন সকলেই একদিন নিজেদের বসত ভিটা ছেড়ে ঢুকে পড়বেন দেশে। কিন্তু সকলের সামর্থ্য হয় না। নেই সরকারি সাহায্য। গীতাঞ্জলি, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় কেউ কেউ ঘর পেয়েছেন। তবে নাপাওয়া সংখ্যাটাই বেশি। নিজের বাড়ি ভেঙে ফেলে নতুন করে জায়গা কিনে বাড়ি তৈরির মতন সামর্থ্য কজনের থাকে। নানা ভয়ে সত্য কথা বলার উপায় নেই। মল্লিকপুরের পঞ্চায়েত সদস্যা সিপ্রা রায় জানান, সকলের বাড়ি করা নাগেলেও বাড়ি করবার মতন একটা কলোনির জায়গা তৈরি করা হয়েছে।

পঞ্চায়েত উপপ্রধান আবু তালেব মিঞা জানান, জিরো পয়েন্টে থাকা অধিবাসীদের পূনর্বাসনের বিষয়টি দেখছে ব্লক প্রশাসন। নির্বাচন বিধি চালু হবার কারণে এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। জিরো পয়েন্টর বাসিন্দা অমল রায়, বিনয় রায়রা এবারও ভোট দেবেন কাঁটাতার পেড়িয়ে এসে। ভোট দেবেন ক্ষোভ নিয়ে। কারণ অনেক। তবে বলা বারণ। যদি গেট বন্ধ হয়ে যায়।