চিকিৎসকদের গাড়ি নিয়ে কলকাতা যাতায়াতে কড়া হচ্ছে স্বাস্থ্য দপ্তর

424
ফাইল ছবি

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: সরকারি নির্দেশিকা উড়িয়ে লকডাউনের মধ্যেই রাতের অন্ধকারে রায়গঞ্জ থেকে গাড়ি করে কলকাতা যাওয়া-আসা করছেন কিছু চিকিৎসক। গ্রিন জোনে থাকা উত্তর দিনাজপুর থেকে রেড জোনের কলকাতায় এভাবে চিকিৎসকদের যাতায়াতে সংক্রমণের আশঙ্কা থেকেই যায়। সেকারণেই চিকিৎসকদের এভাবে আসা-যাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে স্বাস্থ্য দপ্তর। অভিযোগ, তাতে কর্ণপাত করছেন না অনেকেই। এই পরিস্থিতিতে রাযগঞ্জ মেডিকেলকে কড়া বার্তা দিল রাজ্যের স্বাস্থ্যদপ্তর।

রাজ্যের স্বাস্থ্য ভবন থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকদের বাড়িতে না যাওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। অভিযোগ, সেই নির্দেশনামা মানছেন না রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের কিছু চিকিৎসক। শনিবার গভীর রাতেও একদল চিকিৎসক চুপিসারে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ থেকে কলকাতার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। জেলা প্রশাসন, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর, রাজ্য স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশকে অমান্য করেই চিকিৎসকরা এভাবে আসা-যাওয়া করছেন।

- Advertisement -

বিজেপির উত্তর দিনাজপুর জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ লাহিড়ি বিস্ফোরক অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, শনিবার গভীর রাতে একদল চিকিৎসক তিনটি গাড়ি ভাড়া করে রায়গঞ্জ থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এই ধরনের ঘটনায় রায়গঞ্জের বাসিন্দারা আতঙ্কিত। বিজেপির তরফ থেকে জেলা প্রশাসনের কাছে ডেপুটেশন দেওয়া হবে।

এদিকে, বাইরে থেকে জেলায় যাতায়াতের ব্যাপারে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের কড়া বার্তা দিল রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর। আপাতত কোনওভাবেই জেলার বাইরে যাওয়া চলবে না, এই বার্তা রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসকদের দিয়েছেন উত্তরবঙ্গের ওএসডি (কোভিড ১৯) সুশান্ত রায়।

চিকিৎসকরা এই মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। তবে এই প্রচণ্ড মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করার পর যে ছুটি তাঁরা পাচ্ছেন, তখন অনেক চিকিৎসকই তাঁদের বাড়িতে চলে যাচ্ছেন। আবার সেই সব জায়গা থেকে উত্তর দিনাজপুরে ফেরার সময় কোনওরকমভাবে করোনার বাহক হয়ে যাওয়ার একটা আশঙ্কা থাকছে। যদি তা হয, তবে চিকিৎসা পরিষেবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারি নিয়ম মেনে ছুটি পেলেও বাইরের চিকিৎসকদের রায়গঞ্জেই থাকতে হবে বলে দাবি করেছেন স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকরা। এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করা হয়েছে সম্প্রতি। সেখানে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষকে এই বার্তা স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক রবীন্দ্রনাথ প্রধান বলেন, আমরা চিকিৎসকদের যাতাযাত নিয়ে বৈঠক করেছি। সেখানে বারবার জেলার বাইরে যাতাযাতের বিষয়টি নজর রাখার জন্য রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষকে বলা হয়েছে। কোনওভাবে চিকিৎসকরা ঘনঘন বাইরে যাতায়াত না করেন, তা নিশ্চিত করতে সরকারি নির্দেশ অধ্যক্ষকে জানানো হয়েছে। খুব প্রযোজনে যদি কোনও চিকিৎসক জেলার বাইরে যেতে চান, তার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি অধ্যক্ষ অবশ্যই দেবেন। যাতে কোনওভাবেই চিকিৎসকরা অসুবিধায় না পড়েন, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি কয়েকজন চিকিৎসকের বারবার যাতায়াতের ফলে কোনওভাবে বাকি স্বাস্থ্যকর্মীরা যাতে সমস্যায় না পড়েন, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।

এ বিষযে রায়গঞ্জের পুরপ্রধান সন্দীপ বিশ্বাস বলেন, রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। জেলাশাসকের উপস্থিতিতে চিকিৎসকদের যাতাযাত নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে। চিকিৎসকদের বারবার যাতায়াতের বিষয়টি পুরোপুরি নজরে রাখার জন্য রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষকে বলা হয়েছে। চিকিৎসকরা বারবার যাতাযাত করছিলেন বলে একটা অভিযোগ উঠেছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ওই বৈঠক করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রায় ১৮২ জন চিকিৎসক রয়েছেন। করোনা সংক্রমণের ফলে এই মুহূর্তে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার ফলে চিকিৎসকদের ওপর বাড়তি চাপ রয়েছে। তাই সরকারি নির্দেশ মতো রোটেশন করে কাজ এবং ছুটির ব্যবস্থা করেছে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে ছুটি পেলেই বাইরে থেকে চাকরি করতে আসা চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছেন।

তাঁরা আবার মূলত কলকাতা সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা, তাই সেখান থেকে যখনই তাঁরা ফিরছেন, তাঁদের নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। ছুটির সময় বাড়িতে থাকার পর যখন তাঁরা ফিরছেন, তখন তাঁদের জন্য আলাদা করে কোনও কোয়ারান্টিনের ব্যবস্থা না করায় এই আশঙ্কা আরও বাড়ছিল। এই অবস্থায় বারবার চিকিৎসকদের যাতায়াতের ওপর লাগাম পরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে মেডিকেল কলেজের সহকারি অধ্যক্ষ প্রিয়ঙ্কর রায় বলেন, রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে যে নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে, তা সব ডাক্তারদের জানানো হয়েছে। যে সব স্বাস্থ্যকর্মী মাসখানেক ধরে আসছেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসক, নার্স ও অ্যাকাউন্ট্যান্ট অফিসারকে হোম কোয়ারান্টিনে রাখা হয়েছে। তাঁদের লালারস পাঠানো হয়েছে মালদা মেডিকেল কলেজে ও উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে। সেই রিপোর্ট এলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে রাযগঞ্জ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ।