লকডাউনে ব্যাপক ক্ষতি শিলিগুড়ির ক্রীড়া জগতের ব্যবসায়

134

শুভময় সান্যাল, শিলিগুড়ি : ঋদ্ধিমান সাহার ছোটবেলার ক্লাব অগ্রগামী সংঘে ছাত্রদের বলা হয়েছে একটা কথা। এতদিন যা শিখেছে বাড়িতে, সেটাই শ্যাডো করে যাও। ছাদে ব্যায়াম চালিযে যাও।  তবে এসব যে আদৌ সমাধান নয় তা মেনে নিলেন অগ্রগামী সচিব পার্থসারথি দাস, এই অবস্থায় বাঁচার কথা সবার আগে ভাবতে হবে। খেলা তো তারপর। শিলিগুড়ির খেলোয়াড় ও কর্তাদের এখন কী দুর্দশা, তা এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যাবে। কোচদের অবস্থা খুব খারাপ হচ্ছেই। শহরের দুই ক্যারাটে কোচ বাড়ির সামনে ফল বিক্রি করছেন। বাধ্য হয়ে দুই ফুটবল ও অ্যাথলেটিক্স কোচকে সাহায্য করেছেন ছাত্ররা।

স্পোর্টস অ্যাকাডেমির সামনে কচিকাঁচা আর তাদের অভিভাবকদের ভিড় দেখতেই অভ্যস্ত ছিলেন শিলিগুড়ির মানুষ। উধাও সেই চেনা ছবি। গত বছরই কোচিং সেন্টার, অ্যাকাডেমিগুলির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছোঁয় ৩০ শতাংশ। রামকৃষ্ণ ব্যায়াম শিক্ষা সংঘের ব্যাডমিন্টন সচিব ধ্রুবজ্যোতি দাস মনে করছেন, করোনার জেরে তৈরি হওয়া ক্ষতি সামাল দিতে  ৫-৭ বছর লেগে যাবে। তাঁর সঙ্গে একমত অনেকেই। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে সামাল দেওযার চেষ্টা করেও সাফল্য পাওযা যায়নি। বাধ্য হয়ে কোচিং সেন্টার, অ্যাকাডেমিগুলি কাটছাঁট করেছে কোচদের ফি। কোথাও বা পুরোপুরি বন্ধ।

- Advertisement -

ধাক্কা লেগেছে খেলোয়াড়দের জীবনেও। একের পর এক টুর্নামেন্ট বন্ধ হওয়ায় তাঁদের পেমেন্ট বন্ধ হযে গিয়েছে। বিভিন্ন বয়সসীমার খেলোয়াড়দের বযস বেড়ে যাওযা, একা একা লক্ষ্যহীন প্র‌্যাক্টিসের একেঘেয়েমি- খেলায আগ্রহ হারাচ্ছে নতুন প্রজন্ম।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থা টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন, ক্যারাটেতে। ওয়াইএমএ-তে টিটি কোচ সুব্রত রায়ের কথায়, ২০১০ সাল থেকে ধরলে প্রতি মাসে গড়ে এখানে ৭০ জন ট্রেনিং নিত। সেপ্টেম্বরে অনুশীলন শুরুর পর দেখলাম অন্তত ২০ জন ফিরল না। এমন ট্র‌্যাজেডির সাক্ষী শিলিগুড়ির টিটির অন্য দুই মুখ- সেহগল ইনস্টিটিউটের সচিব সন্দীপ চক্রবর্তী ও উত্তরবঙ্গ টেবিল টেনিস অ্যাকাডেমির প্রধান অসিতাভ দত্ত। আয় কমে যাওযার কথা স্বীকার করেন শিলিগুড়ি টিটি অ্যাকাডেমির কোষাধ্যক্ষ ও চিফ কোচ অমিত দাম, ২০১৫ থেকে অ্যাকাডেমির বার্ষিক আয় ছিল ১০ লক্ষ টাকা। এর থেকেই কোচ, অফিসকর্মীদের বেতন, ইলেক্ট্রিক বিল, পরিকাঠামো উন্নয়নের খরচ মেটানো হত। গত বছর প্রায় ৩ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এবার মাত্র ২০ জনকে নিয়ে ট্রেনিং শুরু করেছি। জানি না ক্ষতির পরিমাণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? রেইনবো টিটি কোচিং সেন্টারের সচিব ইন্দ্রজিৎ চন্দের মন্তব্য, গতপুজোর পর ক্ষতি স্বীকার করেই কোচিং সেন্টার খোলা রেখেছিলাম। এবার কতজন ফিরবে এখনও বুঝতে পারছি না। অথচ স্যানিটাইজেশন, ইলেক্ট্রিক বিল- সব খরচই বাড়ছে।

ছেলেমেয়েদের খেলায় ধরে রাখতে কিছু পদক্ষেপ করেছিল ওয়াইএমএ। সুব্রতবাবু বলছিলেন, কোচিং সেন্টারে অনুশীলন বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীরা নিজের খেলার ভিডিও তুলে কোচদের পাঠাত। সেটা বিশ্লেষণ করে ওদের কোথায় উন্নতি প্রয়োজন বুঝিয়ে দেওয়া হত। বিদেশি বা বাইরের রাজ্যের খেলোয়াড়ের ভিডিও দেখিয়ে তাদের শক্তি-দুর্বলতা বোঝানো হয়েছে। তাতে কি খুব লাভ হল?

কোচিং সেন্টার, অ্যাকাডেমিতে শিক্ষার্থী কমা এবং আর্থিক ক্ষতি- স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছে কাইজেন ক্যারাটে অ্যাকাডেমি। ডিরেক্টর দেবাশিস ঢালির তথ্য, আমাদের ১২টা ব্রাঞ্চ থেকে বছরে ৮-৯ লক্ষ টাকা রোজগার হত। গত জানুযারিতে সেটা নেমে গিয়েছিল ৭০ শতাংশে। এখন আবার সব বন্ধ। গত বছর অ্যাকাডেমির সঞ্চয় থেকে চার মাস কোচ-কোচিং স্টাফদের বেতন দেওয়া হয়েছে। তারপর সেটা পারা যাযনি।

সুদিন ফেরাতে ক্রীড়া সংগঠনগুলি তাকিয়ে টিকাকরণের দিকে। ইতিমধ্যেই মহকুমা ক্রীড়া পরিষদ ও বেঙ্গল স্টেট টেবিল টেনিস সংস্থার (চ্যাপ্টার-২) থেকে টিকার আবেদন জানিয়ে চিঠি জমা পড়েছে জেলা শাসক, পুরনিগমের প্রশাসকের কাছে। প্রশ্ন একটাই। শিলিগুড়ির ক্রীড়াজগতের পুরোনো ছবি কবে ফিরবে?