চাতরা বিল ভরাট করছে জমি মাফিয়ারা

জসিমুদ্দিন আহম্মদ, মালদা : জমি মাফিয়াদের হাতে পড়ে বুজে যাচ্ছে চাতরা বিল। বিলের বিশাল অংশে ইতিমধ্যেই অবৈধভাবে নির্মাণকাজ হয়েছে। বিলের বুকে গজিয়ে উঠেছে ঘরবাড়ি। এবার জলনিকাশি ব্যবস্থার বারোটা বাজিয়ে বিলের পশ্চিম প্রান্তে বাঁধ দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ অবৈধ ও অবৈজ্ঞানিকভাবে। যার ফল ভুগতে হচ্ছে মালদা শহরের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের। বৃষ্টি হলেই জলে হাবুডুবু খাচ্ছে শহরের গান্ধি পার্ক, নেতাজি পার্ক, রায়পাড়া, লেক গার্ডেন এলাকাগুলিকে। গত তিন বছর ধরে একই পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। বিপাকে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সমস্যার কথা একাধিকবার ইংরেজবাজার পুর কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান করার ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপ করছে না তারা।

বাসিন্দাদের দাবি, কিছুদিন আগে সমস্যার কথা পুরপ্রশাসক নীহাররঞ্জন ঘোষকে জানাতে গেলে তিনি কথা শুনতে রাজি হননি। উলটে দুর্ব্যবহার করে দপ্তর থেকে বের করে দিয়েছেন। অভিযোগ প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন ঘোষের বক্তব্য, ওই এলাকার বাসিন্দারা বিলের জমিতে বাড়ি তৈরি করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে জল জমবে। আর তাঁদের সঙ্গে কোনও দুর্ব্যবহার করা হয়নি। বর্তমান করোনা আবহে দপ্তরের মধ্যে এক সঙ্গে ২০-২৫ জন ঢোকেন। আমরা তাঁদের জানাই, ১ জন কথা বলুন, বাকিরা বাইরে থাকুন। উলটে তাঁরাই দপ্তরে চ্যাঁচামেচি করছিলেন। এই সমস্যা আজকে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কিছু অসাধু মানুষ ওই বিলকে বুঝিয়ে জমি কেনাবেচার ব্যবসা চালাচ্ছে। ফলে শুধু ওই ওয়ার্ডের নয়, শহরের একাংশের জলনিকাশি ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। পুরসভা এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে গোদরাইল সাঁকোর সংস্কার ও ক্যানেল তৈরির মাস্টার প্ল্যান তৈরি করেছে। সেচদপ্তরের সবুজ সংকেত মিললেই কাজ শুরু হয়ে যাবে। আশাকরি মালদা শহরের জলনিকাশি সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে শীঘ্রই।

- Advertisement -

ইংরেজবাজার পুরসভার ২৫ নম্বর ওয়ার্ড ঘোড়াপির মোড় থেকে শুরু করে নেতাজি পার্ক, রায়পাড়া, লেক গার্ডেন, গান্ধি পার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ওয়ার্ডের পূর্বদিকের গোটা অংশ জুড়ে রয়েছে চাতরা বিল। এই ওয়ার্ডের জলনিকাশি ব্যবস্থা পুরোটাই এই বিলের সঙ্গে সংযুক্ত। প্রায় এক দশক ধরে এই বিল বুজিয়ে ফেলার চক্রান্ত চলছে। অভিযোগ উঠছে, এর পিছনে রয়েছে জমি মাফিয়া থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা, এমনকি সরকারি কর্তারাও। এনিয়ে একাধিকবার লড়াই আন্দোলনে শামিল হয়েছেন শহরের পরিবেশপ্রেমী থেকে শুরু করে চাতরার বিলকে বেষ্টনি করে বসবাসকারী মানুষেরা। তবে আন্দোলন করেও জমি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য রোখা যায়নি। আজও চাতরা বিল বুজিয়ে ফেলার চক্রান্ত চলছে। প্রতিদিন শয়ে শয়ে ট্র‌্যাক্টর থেকে ওই বিলে মাটি ফেলা হয়। চাতরার পশ্চিমপ্রান্তে মাটি ভরাটের ফলে একটা বাঁধ তৈরি হয়ে গিয়েছে। পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে জলনিকাশি ব্যবস্থা।

গান্ধি পার্ক এলাকার আশারাম মণ্ডল বলেন, আমরা বছরে ৭ মাস জলের মধ্যে বাস করি। কারণ, জলনিকাশি ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় কাউন্সিলার থেকে শুরু করে পুরকর্তৃপক্ষ সবাইকেই সমস্যার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছেন না তাঁরা। আমরা পুরসভাকে কর দিই। কিন্তু বিনিময়ে পরিষেবা পাই না। গান্ধি পার্ক এলাকার বাসিন্দা মিলন সাহা বলেন, আমরা এই এলাকায় ২০ বছর ধরে আছি। আগে এই সমস্যা ছিল না। বছর তিনেক ধরে এলাকার জল নামছে না। এবছর সমস্যা আরও বেড়েছে। বর্ষার শুরু থেকেই হাঁটুজল। আর এই জল ভেঙেই বাজারহাট, স্কুল কলেজে যাতায়াত করতে হচ্ছে। হাতে পায়ে জোঁক লাগছে। বাড়ির ভিতরে সাপ-ব্যাং ঢুকে পড়ছে। আমরা পুরসভাকে অভিযোগ জানালে সেখান থেকে বলা হচ্ছে, আমরা নাকি পুকুরের মধ্যে বাড়ি তৈরি করেছি। আমাদের প্রশ্ন, বাড়ি যদি পুকুরে করে থাকি, তবে পুরসভা সেই বাড়ি তৈরির অনুমতি দিল কেন?

লেক গার্ডেনের বসিন্দা গোপাল সাহা বলেন, চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছি। প্রতিদিন জল ভেঙে বাড়িতে যেতে হচ্ছে। জমা জল কিছুতেই নামছে না। আর পুরসভাকে জানিয়ে কোনও ফল হচ্ছে না। আমরা কি করব বুঝে উঠতে পারছি না। সমস্যার সমাধান না হলে পুরভোট দেব না কেউ। স্থানীয় কাউন্সিলার দোলন চাকি জানান, পুরসভায় চোরেদের রাজত্ব চলছে। তাদের মদতেই চাতরা বিল ভরাট করা হচ্ছে। বিল বোজাতে বোজাতে জলনিকাশি ব্যবস্থাও বুঝিয়ে ফেলেছে। আমাদের কোনও কথা শোনে না পুরকর্তৃপক্ষ। বহুবার এনিয়ে আমরা আন্দোলন করেছি। কিন্তু টনক নড়ছে না তাঁদের। মানুষ এদের জবাব দেবে।