পাহাড়-ডুয়ার্সে পর্যটনে ক্ষতি প্রায় একশো কোটি

101

উত্তরবঙ্গ ব্যুরো : করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বেসামাল উত্তরবঙ্গের পর্যটন ব্যবসা। বাতিল হচ্ছে একের পর এক বুকিং। পাহাড় থেকে ডুয়ার্সে কমছে পর্যটকের সংখ্যা। পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিচ্ছে বলে আশঙ্কায় পর্যটন ব্যবসায়ীরা। কীভাবে আগামীদিনে তাঁরা এই শিল্পে টিকে থাকবেন, তা ভেবেই পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত সকলেরই মাথায় হাত পড়েছে। উত্তরবঙ্গের পর্যটন সংস্থা হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড টুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের শীর্ষকর্তা রাজ বসু বলেন, এবার নির্বাচন আট পর্যায়ে থাকায় এমনিতেই বুকিং কিছুটা কম ছিল। তবে, যে এলাকায় ভোটপর্ব শেষ হয়েছে সেখানে পর্যটকরা আসতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে সব  ভেস্তে গেল।

চলতি মাসেই উত্তরবঙ্গে পর্যটন ব্যবসায় ক্ষতি প্রায় একশো কোটি ছুঁইছুঁই। করোনার প্রথম প্রকোপের ধাক্কা সামলে ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াতে থাকা এই ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত উত্তরবঙ্গের প্রায় দেড় লক্ষ ব্যবসায়ীর কপালে চিন্তার ভাঁজ। আগামীতে ব্যবসায় আরও ক্ষতির আশঙ্কা করছেন উত্তরের পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। করোনা সংক্রমণের জেরে গত বছর লকডাউন শুরু হওয়ায় ভয়ংকর সংকটের মুখে পড়েছিলেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘ কয়েক মাস লকডাউন চলার পরে গত বছর পুজোর আগে থেকে কিছুটা হলেও সংক্রমণের হার কমায় ধীরে ধীরে পর্যটকরা আসতে শুরু করেছিলেন পাহাড় ও ডুয়ার্সে। এ বছর দোলের আগে পর্যন্ত উত্তরবঙ্গে পর্যটকের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছিল। প্রতিবছর এই সময় পাহাড়-ডুয়ার্সে পর্যটকদের ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো। দক্ষিণবঙ্গ তো বটেই, ভিনরাজ্য যেমন গুজরাট, মহারাষ্ট্র, দিল্লি থেকেও বহু পর্যটক দার্জিলিং, সিকিম বা ভুটানেও বেড়াতে আসেন এই সময়।

- Advertisement -

গতবছর থেকেই সেই ছবিটা বদলে গিয়েছে। পরপর দুবছর এই সময়ে করোনার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় ফের পর্যটকশূন্য উত্তরবঙ্গ। উত্তরবঙ্গের পর্যটন সংস্থা হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড টুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক সম্রাট সান্যাল বলেন, ভিনরাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যটক তাঁদের বুকিং বাতিল করেছেন করোনার জন্য। চলতি মাসেই গড়ে প্রতিদিন উত্তরবঙ্গে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে পর্যটন ব্যবসায়। এই ক্ষতি কীভাবে মোকাবিলা করব, তা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক বিপ্লব দে বলেন, বহু টুরিস্ট করোনার সংক্রমণের জেরে ইতিমধ্যেই বুকিং বাতিল করেছেন। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে আরও বুকিং বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পাহাড়ের পর্যটনে ইতিমধ্যেই বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। প্রচুর বুকিং বাতিল হয়ে গিয়েছে। ফলে মুখ থুবড়ে পড়ছে পাহাড়ের পর্যটনশিল্প। পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এক বছরের খরা কাটিয়ে চলতি মরশুমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল পর্যটনশিল্প। চলতি গ্রীষ্মের মরশুমে পাহাড়ে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে প্রায় ৭০ শতাংশ বুকিং হয়ে গিয়েছিল। ১৫ এপ্রিল থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দার্জিলিংয়ে এরাজ্য এবং ভিনরাজ্যের পর্যটকদের ভালো বুকিং ছিল। ভালো বুকিং হয়েছিল সিকিমেও। কিন্তু করোনার মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধির জেরে বুকিং বাতিল হচ্ছে। দার্জিলিং অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল অপারেটরস (ডাটা)-র সম্পাদক প্রদীপ লামা বলেন, করোনা আমাদের সর্বনাশ করে দিল। গত বছরও কোনও ব্যবসা হয়নি। এবার ভালো বুকিং হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির জেরে সমস্ত বুকিং বাতিল হচ্ছে।

সম্প্রতি ডুয়ার্স টুরিজম ডেভেলপমেন্ট ফোরামের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, তিস্তা থেকে সংকোশ পর্যন্ত ডুয়ার্সের এই পর্যটন ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৭২ হাজার ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ জড়িত। এঁরা প্রত্যেকেই এই পরিস্থিতিতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন। লাটাগুড়ি রিসর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক দিব্যেন্দু দেব বলেন, পরিস্থিতি খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছে। কর্মীদের বেতন কীভাবে দেব, সেটাই বড় চিন্তার বিষয়।

এই পরিস্থিতিতে দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিটও বাতিল হচ্ছে। গত দুদিন ধরে ট্রেনের যাত্রীসংখ্যাও কমতে শুরু করেছে। পর্যটকনির্ভর আলিপুরদুয়ারে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন হোটেল, রিসর্টে ২৫ শতাংশের বেশি বুকিং বাতিল হয়েছে। জলদাপাড়া লজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, করোনা পরিস্থিতি ফের মাথাচাড়া দেওয়ায় অনেকেই ডুয়ার্স ভ্রমণের জন্য বুকিং বাতিল করছেন। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরয়ার ডিভিশনের সিনিয়ার ডিভিশনাল কমার্সিয়াল ম্যানেজার অমরমোহন ঠাকুর বলেন, গত দুদিন ধরে বেশ কিছু ট্রেনের টিকিট বাতিল হচ্ছে।

কোচবিহার হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ সভাপতি রাজু ঘোষ বলেন, গত বছর করোনার জন্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। পুজোর পর থেকে কিছু কিছু করে বুকিং বাড়ছিল। তবে কিছুদিন থেকে বুকিং বাতিল হচ্ছে। প্রায় ৪০ শতাংশ বুকিং বাতিল করে দিচ্ছেন বাইরের পর্যটকরা। কোচবিহারের এক টুর অপারেটর শুভশংকর চক্রবর্তী বলেন, শীতের মরশুম থেকে ধীরে ধীরে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিলাম। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছিল। কিন্তু বর্তমানে আবার সেই একই পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ওয়েভের কারণে পর্যটকদের সংখ্যা অনেক কমছে। ফলে অনেক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।