হিন্দু প্রতিবেশীর দেহ সৎকারে এগিয়ে এলেন মুসলিমরা

তনয় মিশ্র, মোথাবাড়ি : আবার সম্প্রীতির নিদর্শন দেখা গেল কালিয়াচক-২ ব্লকের পঞ্চনন্দপুরে। লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা ও করোনা গুজবের ভয়কে জয় করে শুক্রবার গ্রামের এক হিন্দু প্রতিবেশীর মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করল মুসলিম যুবকরা। লোয়াইটোলা গ্রামের পর আবার সম্প্রীতির নজির গড়ল পঞ্চনন্দপুরের জাহানটোলা গ্রাম।

মৃত ব্যক্তির নাম তপন প্রামাণিক (৪৮)। জাহানটোলা গ্রামে প্রায় ৮০টি পরিবারের বাস। এর মধ্যে হিন্দু পরিবারের সংখ্যা ৩-৪টি। গত ২০ বছর ধরে এই গ্রামে বাস করে আসছেন তপন প্রামাণিকরা। পরিবারে রয়েছে তিন ছেলে ও স্ত্রী। তপনবাবু গ্রামেই নাপিতের কাজ করতেন। গত এক বছর থেকে তিনি হৃদরোগের সমস্যায় ভুগছিলেন। দুতিন দিন আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে মালদা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। এদিন সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। চরম সংকটে পড়ে তাঁর পরিবার। লকডাউন ভেঙে কোনও আত্মীয়স্বজন দেহ সৎকারে আসবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয় পরিবারে। এছাড়া এখন যে কোনও মৃত্যুতেই করোনার গুজব ছড়িয়ে যাওয়ায় পরিবারের আতঙ্ক চরমে ওঠে। সেই আতঙ্ক কাটাতে এগিয়ে আসেন গ্রামবাসীদের একাংশ। স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য সাইফুদ্দিন শেখ ও কালিয়াচক-২ পঞ্চায়েত সমিতির বনভূমি কর্মাধ্যক্ষ আমিনুর আলমের নেতৃত্বে গ্রামের যুবকরা তপনবাবুর বাড়ি আসেন। তাঁরাই ঝাড় থেকে বাঁশ এনে শববাহী মাচা তৈরি করেন। কাঁধে তুলে নেন তপন প্রামাণিকের মৃতদেহ। গ্রামবাসীরা দেহ নিয়ে যান পঞ্চনন্দপুর গঙ্গাঘাটের একটি শ্মশানে। সেখানে শবদেহ দাহ করা হয়।

- Advertisement -

গ্রামবাসীরা যে বিপদে এত সাহায্য করবেন, তা ভাবতে পারেননি তপনবাবুর পরিবারের সদস্যরা। তপনবাবুর স্ত্রী সুচিত্রা প্রামাণিক জানিয়েছেন, বাড়িতে হঠাৎ জ্বর হয়েছিল। ছয় দিন আগে প্রথমে ওকে বাঙ্গীটোলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করি। তারপর মালদা মেডিকেলে নিয়ে যাই। গতকালও স্বামী খুব ভালো ছিল। চিকিৎসক বলেছিলেন, আজই ওকে ছেড়ে দেওয়া হবে। বেলা তিনটের সময় হঠাৎ ও মারা যায়। ডাক্তার জানিয়েছেন, ও হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছে। আমরা ২০ বছর থেকে এই গ্রামে বাস করে আসছি। আমার সব আপদে-বিপদে গ্রামের সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। হিন্দু বলে কেউ কোনওদিন আমাদের পরিবারের কাউকে একটা কটু কথাও শোনায়নি। আজ স্বামীর মৃত্যুর পর লকডাউনের মধ্যে কীভাবে সৎকার করব, তা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু গোটা গ্রামের মানুষ যেভাবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা কোনওদিন ভুলতে পারব না।

কালিয়াচক-২ পঞ্চায়েত সমিতির বনভূমি কর্মাধ্যক্ষ আমিনুর আলম বলেন, গোটা দেশে বিভেদের রাজনীতি ছড়ানোর চেষ্টা হলেও আমাদের পঞ্চনন্দপুরে হিন্দু-মুসলমানের সৌহার্দ্য কিছুতেই নষ্ট হতে দেব না। লোয়াইটোলার পর জাহানটোলা এই ঘটনা চোখে আঙুল তুলে সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে। এদিন আমিনুর ছাড়াও তপন প্রামাণিকের শেষযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন পঞ্চায়েত সদস্য সাইফুদ্দিন শেখ, স্থানীয় আজিজ মোড়ল, নুরুল শেখ, হাফিজুল শেখ, মন্টু হাসান শেখ সহ একাধিক যুবক। সাইফুদ্দিন শেখ বলেন, আমার বাড়ির পাশেই তপনদার বাড়ি। তাঁর মারা যাওয়ার খবর আমিই প্রথম জানতে পারি। লকডাউনে তাঁর পরিবার চিন্তায় ছিল, কীভাবে শবদেহ দাহ করা হবে। আমাদের মনে হয়েছে বিপদের সময় মানুষকে সাহায্য করাই সবচেয়ে বড় ধর্ম। তাই আমরা গোটা গ্রাম মৃতের পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছি।

পঞ্চনন্দপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান রিজিয়া বিবি বলেন, আমাদের এই এলাকায় হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে একে অপরের সুখে-দুঃখে বেঁচে থাকে। এটাই আমাদের আদর্শ। গোটা দেশে যখন ধর্মে ধর্মে বিভেদ, তখন আমরা এই এলাকায় সবাই একসঙ্গে থাকি। লকডাউন চলাকালীন তপনবাবুর পরিবারকে আমরা সবাই মিলে সাহায্য করতে পেরে খুশি। পঞ্চায়েতের তরফে সমব্যথী প্রকল্পের দুই হাজার টাকাও মৃতের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।