সুভাষ বর্মন, শালকুমারহাট : নলরাজার গড় ও গভীর জঙ্গলের টানেই পর্যটকরা আলিপুরদুয়ার জেলার চিলাপাতায় ছুটে আসেন। কয়েকযুগের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী এই গড়। অথচ আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের এই ঐতিহাসিক স্থানটি অবহেলায় পড়ে রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে মাত্র একবার এই গড়ের কিছুটা খনন করা হয়েছিল। তারপর গড়ের ধ্বংসাবশেষ সুরক্ষিত রাখতে আর সেভাবে পদক্ষেপ করা হয়নি বলে ইতিহাসপ্রেমীদের অভিযোগ। দ্রুত এই নলরাজার গড়ের সংস্কার ও সুরক্ষার দাবি তুলেছে বিভিন্ন মহল।

চিলাপাতার গভীর জঙ্গলের মধ্যে বানিয়াদহ নদীর ধারে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে নলরাজার গড়ের ধ্বংসাবশেষ। জঙ্গলের মধ্যে এই দুর্গটি নিখুঁত পরিকল্পনায় তৈরি হয়েছিল। রাজ্য সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধিকর্তা ও বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ পরেশচন্দ্র দাশগুপ্তের তত্ত্বাবধানে ১৯৬৬-৬৭ সালে মেন্দাবাড়ির চিলাপাতার জঙ্গলে খনন করা হয়েছিল। পরেশচন্দ্র দাশগুপ্ত পরে এই দুর্গ নিয়ে ’অরণ্য ছায়ার দুর্গ’ নামে একটি তথ্যনির্ভর গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেই খনন সম্পূর্ণভাবে করা হয়নি বলে অনেকের দাবি। তাই এই নলরাজার গড়ের প্রতিষ্ঠাকাল ও নামকরণ সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এই গড় ছিল একটি বনদুর্গ। গড়ে ঢোকার জন্য চারটি প্রবেশপথ ছিল। উত্তরদিকে ছিল জলপথ। দুর্গের চারদিকে নির্দিষ্ট পরিমাপে লাল ইটের তৈরি ৪০-৪৫ ইঞ্চি পুরু প্রাচীর ছিল। এই প্রাচীরের চিহ্ন এখনও জঙ্গলের ভেতরে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। এই দুর্গের ভেতরে ও বাইরে ছিল পরিখা। সুবিশাল এই গড়ের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল নিখুঁত।

অনুমান করা হয়, এই গড়টি তৈরি হয়েছিল গুপ্তযুগের শেষের দিকে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মতে, এটি গুপ্তযুগের নিদর্শন। আবার এই গড় বা দুর্গটি পাল যুগেও ব্যবহার হত বলে অনেকে মনে করেন। অন্যদিকে প্রত্নগবেষকদের একাংশের মতে, এটি কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণ নির্মাণ করেছিলেন। কোচবংশীয় রাজারা ভুটানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এই দুর্গে সৈন্য রাখতেন। তবে, এটি মহারাজা নরনারাযণই তৈরি করেছিলেন কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এদিকে, এই নলরাজার গড় নামকরণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। জনশ্রুতি রয়েছে, মহাভারতের নল-দময়ন্তী উপাখ্যানের রাজা নল এই দুর্গ তৈরি করেছিলেন বলে এই নামকরণ। আবার কারও মতে, কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণের নাম অনুসারে এই গড়ের নাম নলরাজার গড়। এখানে নর শব্দটি স্থানীয় উচ্চারণ বিকৃতির ফলে নল-এ রূপান্তরিত হয়েছে।

এর যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ষোড়শ শতাব্দীর দুর্গের মতো। দ্বাদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চল দিয়ে মহম্মদ ইবন বখতিয়ার খলজি তিব্বত অভিযানের এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চিনসম্রাট কুবলাই খানের এই অঞ্চলে যুদ্ধের বিবরণ তবাকাত-ই-নাসিরি ও মার্কোপোলোর বিবরণীতে পাওযা যায়। গড়টি কীভাবে বা কবে ধ্বংস হয়েছিল, সে বিষয়ে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ নেই। কোচবিহারের ঐতিহাসিক খান চৌধুরি আমানতউল্লা আহমেদের মতে, ১৫৩৮ সালে উত্তরবঙ্গে এক বিরাট ভূমিকম্প হয়। অনুমান করা হয়, ওই ভূমিকম্পেই গড়টি ধ্বংস হয়েছিল।

চিলাপাতা ইকো টুরিজম সোসাইটির সম্পাদক গণেশকুমার শা বলেন, এই নলরাজার গড়ের টানেই দেশ-বিদেশের পর্যটকরা চিলাপাতায় আসেন। অথচ গড়ের ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক তথা ইতিহাসবিদ আনন্দগোপাল ঘোষ বলেন, বহুদিন আগে একবার কিছুটা খনন হলেও পরে আর সেভাবে সরকারি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ পদক্ষেপ না করায় নলরাজার গড়ের মাধ্যমে ইতিহাসের মিসিং লিংক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সঠিকভাবে কাজ হলে ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য বেরিযে আসবে। তাই প্রত্নতত্ত্ববিদদের সাহায্যে আবার চিলাপাতায় খননকার্য ও ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণের জন্য পদক্ষেপ করা উচিত বলে তিনি জানান।