ছত্রধরকে হেপাজতে নিতে মরিয়া এনআইএ

298

কলকাতা : আবার বিপদ ছত্রধর মাহাতোর। পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটির প্রাক্তন মুখপাত্র আবার হেপাজতে যেতে পারেন। এবার আর পুলিশ হেপাজত নয়। ছত্রধর মাহাতো সহ ৫ জনকে হেপাজতে নিয়ে জেরা করতে চায় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। শুক্রবার এনআইএর বিশেষ আদালতে এজন্য হলফনামাও দাখিল করেছিল সংস্থাটি। তবে এদিনই হেপাজতের অনুমতি দেয়নি আদালত। হলফনামার প্রতিলিপি অভিযুক্তদের আইনজীবীদের না দেওয়ায় আইনি জটিলতা দেখা দেয়। পরে ৫ জন অভিযুক্তের আইনজীবীকে হলফনামার প্রতিলিপি দেওয়ার জন্য এনআইএ-কে নির্দেশ দেয় বিশেষ আদালত। প্রতিলিপি দেওয়ার পর আগামী সোমবার আবার মামলাটির শুনানি হবে। সেদিন অভিযুক্তদের সশরীরে হাজির থাকতে বলা হয়েছে। অনেকেই তাই মনে করছেন, ছত্রধরের হেপাজতে যাওয়া সময়ে অপেক্ষা মাত্র। জঙ্গলমহলের সিপিএম নেতা প্রবীর মাহাতো খুন ও ভুবনেশ্বর-রাজধানী এক্সপ্রেস হাইজ্যাকের চেষ্টার মামলায় অভিযুক্ত এই ৫ জন। ইউএপিএ আইনে ওই মামলায় ছত্রধরদের জেরা করার জন্য এদিন হেপাজতে চেয়ে আদালতে আবেদন করেছিল এনআইএ।

২০০৯ সালে জঙ্গলমহলের সিপিএম নেতা প্রবীর মাহাতো খুন হন। ওই বছরেই ভুবনেশ্বর-রাজধানী এক্সপ্রেসকে জঙ্গলমহলে আটকায় মাওবাদীরা। সেইসময় ছত্রধর মাহাতো পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটির মুখপাত্র ছিলেন। মাওবাদী আন্দোলনের সঙ্গে ওই কমিটির যোগ ছিল বলে অভিযোগ। ছত্রধরের বিরুদ্ধে সেইসময় একাধিক অভিযোগ দায়ের হয়। ২০১১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তিনি তৃণমূলকে সমর্থন করলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর পুলিশ ছত্রধরকে গ্রেপ্তার করে। কয়েক বছর কারাবাসের পর এবছরের ফেব্রুয়ারিতে ছাড়া পান ছত্রধর। সবাইকে চমকে দিয়ে এরপর ছত্রধর তণমূলে যোগ দেন। রাতারাতি তাঁকে দলের রাজ্য কমিটির সম্পাদক নিযুক্ত করেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জঙ্গলমহলে গিয়ে সবে সংগঠনের কাজ শুরু করেছিলেন ছত্রধর। এই সময় ২০০৯ সালের পুরোনো ওই দুটি মামলায় আবার তৎপর হয়ে ওঠে এনআইএ।

- Advertisement -

লকডাউনের মধ্যে প্রথমে তাঁকে কলকাতায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এনআইএর দপ্তরে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ছত্রধরের আইনজীবী আদালতকে জানান, জঙ্গলমহল থেকে লকডাউন পরিস্থিতিতে তাঁর মক্কেলের পক্ষে কলকাতায় আসা সম্ভব নয়। এরপর আদালতের নির্দেশে গত মাসে শালবনির কোবরা ক্যাম্পে পরপর দুদিন ছত্রধরকে তদন্তকারীরা ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ছত্রধর এই প্রক্রিয়ায় এনআইএ-র সঙ্গে সহযোগিতাই করেন। তারপর এদিন আবার তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। বৈজনাথ টুডু, দিলীপ মাহাতো, চন্দ্রশেখর টুডু ও মৃণালকান্তি মাহাতো নামে আরও পাঁচজনকেও জেরায় ডাকা হয়। এনআইএ এদিনই এই পাঁচজনকে হেপাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন জানায় আদালতে। ছত্রধরের আইনজীবীরা ওই হলফনামা খতিয়ে দেখার জন্য সময় চান আদালতের কাছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এদিন এনআইএ-র আইনজীবীকে প্রতিলিপি দিতে বলেন। সোমবার পরবর্তী শুনানিতে পাঁচ অভিযুক্তকে হাজির থাকার নির্দেশ দেন বিচারপতি। এদিন শুনানি চলাকালীন ছত্রধর অসুস্থ বোধ করেন। ছত্রধরের আইনজীবী বলেন, আমরা আজ এনআইএর হলফনামার প্রতিলিপি পেয়েছি। সোমবার আদালতে যা বলার বলব।

১১ বছর পর এই মামলাটি নিয়ে আবার নতুন করে এনআইএ-র সক্রিয়তার পিছনে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির অভিযোগ উঠছে। তৃণমূলে যোগ দেওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে মামলাটি খুঁচিয়ে তোলা হয়েছে বলে জল্পনা শুরু হয়েছে। এর আগে মুকুল রায় ও অন্যান্য বিজেপি নেতারা ছত্রধরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে দলে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ছত্রধর তাঁদের প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে তৃণমূলে সক্রিয় হন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে জঙ্গলমহল এলাকায় তৃণমূলকে কুপোকাত্ করে দিয়েছিল বিজেপি। হৃতজমি পুনরুদ্ধারে মমতা তাঁর সেনাপতি হিসেবে ছত্রধরকে নিযোগ করেন বলে মনে করা হয়। এরপরই জঙ্গলমহল এলাকায় মাওবাদী কার্যকলাপ নতুন করে মাথা চাড়া দিচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। ইতিমধ্যে জঙ্গলমহলে বাড়তি কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানোর ঘোষণাও করা হয়েছে। আগামীদিনে রাজ্য-রাজনীতিতে এই মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে একারণেই।

এদিকে, জঙ্গি সন্দেহে ধৃত কলেজ ছাত্রী তানিয়া পারভিনের বিরুদ্ধে এনআইএ ইতিমধ্যে চার্জশিট জমা দিয়েছে। তার বিরুদ্ধেও ইউএপিএ আইনে মামলা রুজু হয়েছে। ওই মামলায় পরবর্তী শুনানি হবে ১ নভেম্বর। বৃহস্পতিবার এনআইএর তরফে ৭৪০ পাতার নথি বিশেষ এনআইএ আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। মার্চ মাসে উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়া থেকে স্নাতকস্তরের ছাত্রী তানিয়াকে গ্রেপ্তার করে রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স। পরবর্তীকালে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব নেয় এনআইএ। পাকিস্তানের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তইবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করে তানিয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রুপ তৈরি করে যুবক-যুবতিদের জেহাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে মডিউল তৈরি করেছিল সে। বাদুড়িয়ায় বসে সে অনলাইনে জঙ্গি নিয়োগের কাজ চালাত।