অভাবের সীমান্তে একমাত্র ভরসা ভিন রাজ্যে পাড়ি ও চোরা চালান

230

হেমতাবাদ: এক ফালি ভিটে আগলে সীমান্তের সংসার সামলাচ্ছে ঊনসত্তর বছর বয়সি হাফিজ আলম। একমুঠো মোটা চালের ভাত সঙ্গে আলু সেদ্ধ। এটাই প্রতিদিন দু’বেলার খাবার। লকডাউনে ভিন রাজ্য থেকে ফিরে এভাবেই দিনযাপন চলছে। বৃদ্ধের কথায়, ‘লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে তৈরি কাঁটাতারের বেড়া যেন আমাদের বন্দি করে রেখেছে। অথচ পেট ভরানোর ব্যবস্থা নেই। লকডাউনে কয়েকদিন বিনে পয়সায় খাওয়ার চাল আলু ডাল পেয়েছিলাম। কিন্তু দু’মাস থেকে কিছুই মেলে না। এখন ভিক্ষা করে দিন কাটছে।’ করোনা আবহে উত্তর দিনাজপুরের হেমতাবাদ ব্লকের সীমান্ত এলাকার ছবি।

স্বাভাবিক জীবন লন্ডভন্ড হয়েছে। অথচ প্রশাসন খোঁজ রাখেনি বলে অভিযোগ। হেমতাবাদ থানা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে ভারতের সীমান্তে চৈনগর। পঞ্চায়েত থেকে ১০০ দিনের প্রকল্পের কাজ দিচ্ছে না? প্রশ্ন শুনে খুব উগ্র দেন সীমান্তবাসী মজলিস রহমান। তাঁর অভিযোগ পঞ্চায়েতের কাজ হয়েছে কিন্তু তিনি গত বছর মাত্র আট দিন কাজ পেয়েছেন। কিন্তু টাকা ব্যাংকে জমা হয়নি। এরপর মজুরি টাকার জন্য কয়েকবার পঞ্চায়েত অফিসে যান। প্রধান জানান, ভোটের পর টাকা আসবে।

- Advertisement -

হেমতাবাদ বিধানসভার অন্তর্গত ভাতুন গ্রাম পঞ্চায়েতের উপর ভরসা হারিয়ে সীমান্ত লাগোয়া মালদোখন্ড, বসতপুর, ভাটোল,ধলগা,ডাঙ্গাপাড়া, মমিনটলা,সনগাঁও, প্রতাপপুর, ধলগাঁও,ফুলকা সহ একাধিক গ্রামের যুবক লকডাউন এর পরে রোজগারের আশায় গুজরাট, পঞ্জাবের লুধিয়ানা, পানিপথ, দিল্ল্‌ মুম্বাইয়ের থানে পাড়ি দিয়েছেন। আর তার পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশের একাধিক এলাকায় চলছে গভীর রাতে চোরা কারবার। প্রায় ৬০ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে হেমতাবাদ সীমান্ত এলাকা। তার মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার ভোটার। গোরু পাচার এখন কিছুটা কম তবে বেআইনি কাশির সিরাপ হাতবদল হয়ে ওপারে পৌঁছানোর ঘটনা এখনো চলছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান। আর এই বেআইনি কাজের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে অভাব। স্থানীয় বাসিন্দা বছর চব্বিশের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হামিদুর রহমান বলেন, ‘পাকা রাস্তা গরে ঠিকাদার ও নেতাদের রোজগার হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের আয়ের পথ খুলেনি ফলে মাঝপথে স্কুল ছেড়ে বাইরে কাজের খোঁজে চলে যাচ্ছে অনেকে। আবার অনেকেই অন্ধকারে টাকা আয়ের পথ খুঁজে বের করছে।’

প্রতাপপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য বলেন, ‘সীমান্ত গ্রামের অধিকাংশ যুবকরা ১০০ দিনের কাজ সহ সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে বঞ্চিত সেই কারণেই অনেকে গোরু পাচারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। হেমতাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রের প্রায় কুড়ি হাজার যুবক ভিন রাজ্যে শ্রমিকের কাজে কর্মরত। গোরু পাচারকারীদের সঙ্গে বিএসএফের যোগসূত্র থাকায় সীমান্তের লাগোয়া গ্রামে ভুট্টাক্ষেত গমক্ষেত দিনের পর দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিএসএফের আধিকারিক সহ জেলাশাসককে আমরা লিখিত অভিযোগ করেছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। মাস কয়েক আগে বিএসএফের এক অফিসার ও কনস্টেবল গোরু পাচার করার সময় কর্তব্যরত জোয়ানের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েন ওই কনস্টেবল গোরু পাচারে বাঁধা দেওয়ায় পুলিশের অফিসার তাকে সাসপেন্ড করার হুঁশিয়ারি দেন। এরপরেই তার কাছে থাকা রাইফেল দিয়ে একের পর এক গুলি করে বিএসএফের ওই অফিসার তার সঙ্গে থাকা কনস্টেবল গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয়। এরপর ভাটোল ফাঁড়ির পুলিশ, রায়গঞ্জ থানার পুলিশ ও জেলা পুলিশের কর্তারা অভিযুক্ত জাওয়ানকে ধরে ফেলে।’ তার বিরুদ্ধে একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা করার পাশাপাশি ম্যারাথন জেরায় উঠে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ভাতুন গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ইউসুফ আলী বলেন, ‘১০০ দিনের কাজ সহ একাধিক সরকারি প্রকল্পে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে গ্রামবাসীদের। সেই টাকা তাদের পোষাবে না বলেই তারা ভিন রাজ্যে শ্রমিকের কাজে গিয়েছে। তবে গোরু পাচারের ব্যাপারে উনি কোন মন্তব্য করতে চাননি।’ যদিও বিজেপি কংগ্রেস ও সিপিএমের নেতাদের একটাই বক্তব্য, গোরু পাচারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শাসকদলের নেতারা।