সংগঠন না চিনে চিঠির তর্জনে স্বখাত-সলিলে

853

দেবপ্রসাদ রায়: এখন কয়েকদিন সংবাদমাধ্যমে কাটাছেঁড়া চলবে, পত্রবাণ নিক্ষেপকারী কংগ্রেসের ২৩ জন এরপর কোন পদক্ষেপ করবেন অথবা এই বিতর্ক সৃষ্টিকারী পদক্ষেপ করা সমীচীন হয়েছে কি না ইত্যাদি। আপাতদৃষ্টিতে এই চিঠি লেখার জন্য নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা প্রকাশের কোনও বার্তা আছে বলে কাউকে মন্তব্য করতে দেখিনি। যাঁরা এই পত্র কাণ্ডে পরোক্ষে বিজেপির হাত শক্ত করার অভিযোগ আনছেন, তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা থেকে এই ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। এর পিছনে অন্য উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। আমরা সাদা বাংলায় যেটা বলি, ‘যায় শত্রু পরে পরে।’ জি-২৩ এ এমন অনেকে আছেন, যাঁরা (গুলাম নবি আজাদ, আনন্দ শর্মা, মুকুল ওযাসনিক, মণীশ তিওয়ারি) ছাত্র-যুব সংগঠন থেকে উঠে এসেছেন। তবুও তাঁরা কোণঠাসা। পত্র কাণ্ডের পর মোহন কান্ডোজি বেঙ্গালুরু থেকে ফোনে বললেন, দাদা, তুমি ঘটনাটা কীভাবে দেখছ? আগে উনি যুব কংগ্রেসে ছিলেন, এখন এমএলসি। আমি মোহনকে বললাম, আমি তো এর ভিতর কোনও অন্যায় দেখছি না। নেতৃত্ব নিয়ে চিঠিতে কোনও সমালোচনা নেই, বরং পরামর্শ আছে। উনি বললেন, ঠিকই, তবুও চিঠি না লিখে সোনিয়াজির সঙ্গে ২৩ জন দেখা করে তো কথাগুলো বলতে পারতেন। তাহলে এই আক্রমণের মুখে পড়তে হত না। আমারও মনে হল মোহন ঠিক বলছেন। পত্রাচার না করলে, এই কোণঠাসা অবস্থায় যেতে হত না। কিন্তু একঘরে হয়ে পড়ার এটাই কিন্তু একমাত্র কারণ নয়।

১৯৮৫ সালে আম্তর্জাতিক যুব উৎসবের প্রস্তুতি কমিটির মিটিংয়ে যোগ দিতে হাভানা গিয়েছিলাম। সীতারাম ইয়েচুরিও ছিলেন। চার্টার্ড ফ্লাইটে মস্কো থেকে হাভানা। সব ডেলিগেটের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচয় হচ্ছে। কেউ বাহরিন থেকে, কেউ চাদ থেকে, কেউ ইয়েছেন থেকে যাচ্ছেন। যখন জানতে চাইলাম, তোমরা মস্কোতে কে কবে এলে? ওরা বললেন, আমরা মস্কোতেই থাকি, দেশে যে শাসন চলছে, তাতে ওখানে পা রাখলেই জেলে যেতে হবে। জ্ঞানী জৈল সিং বলতেন, কংগ্রেসে দু’ধরনের নেতা হয়। স্টেট লিডার আর স্টেট লেস লিডার। স্টেট লেস লিডারদের ন্যাশনাল লিডার বলে চালানো হয়। গুলাম নবি ১৯৭৭ সালে নিজের বিধানসভা কেন্দ্র (ডোডা) থেকে প্রতিদ্বন্দিতা করে ২৬৫ ভোট পেয়েছিলেন। তরুণ ঝকঝকে কাশ্মীরি (যদিও ডোডা জম্মু ও কাশ্মীরের সীমান্তে অবস্থিত) সঞ্জয় গান্ধির পছন্দের যুবনেতা। ইন্দিরাজি তাঁকে ওয়াসিম (মহারাষ্ট্র) থেকে জিতিয়ে আনলেন। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। তিন বছর কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রীও থেকেছেন। ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, কাশ্মীরের সব নেতা বন্দি হলেও গুলাম নবি বাইরে কেন? নিশ্চয়ই শাসকদলের সঙ্গে গোপন আঁতাত আছে। এই অভিযোগ যাঁরা করেছেন, তাঁরা নেহাতই মানুষটিকে বিব্রত করার জন্য করেছেন।

- Advertisement -

খেয়াল করলে দেখা যাবে, গ্রেপ্তার তাঁরাই হয়েছেন, যাঁরা উপত্যকায় প্রভাবশালী। রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতিকেও (জি এ মির) গ্রেপ্তার করেনি। কারণ যাঁরা উত্তাল সময়ে জম্মুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে উপত্যকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, মোদি সাহেব তাঁদের গ্রেপ্তার করে গুরুত্ব বাড়াতে চাননি। নয়ের দশকে উপত্যকা ছেড়ে সবাই যখন জম্মু অথবা দিল্লিতে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন একা রফিক সাদিক (প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জি এম সাদিকের ছেলে) উপত্যকা আঁকড়ে পড়েছিলেন। তবুও এআইসিসি পর্যবেক্ষক নাজমা হেপতুল্লা (পরে বিজেপিতে যোগ দেন) তাঁকে সভাপতি না করে রাজ্য কংগ্রেসের দায়িত্ব দিতে জম্মুর বানিহাল থেকে কোনও এক পুনিছের নাম সুপারিশ করলেন। আনন্দ শর্মা একবারই ১৯৮২-তে সিমলা বিধানসভা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। পরাজিত হয়ে আর ওমুখো হননি। তারপর থেকে রাজ্য বদলে বদলে রাজ্যসভায় টিকে আছেন। মুকুল ওয়াসনিক নাগপুরের বাসিন্দা। বাবার জেতা আসন (বুলডানা) থেকে বার দুয়েক জিতেছেন। যুব কংগ্রেসের সভাপতি হয়ে প্রথমেই নাগপুরের এমপি বনোয়ারিলাল পুরোহিতের অনুগামীদের বিতাড়ন শুরু করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত বনোয়ারিলাল পুরোহিত নিজেই কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে চলে গেলেন। কিন্তু মুকুল আর বুলডানাতে জয়ের মুখ দেখেননি। ওঁরা সবাই সেই বাহরিন, চাদ, ইয়েছেনের প্রতিনিধিদের মতো এখন নিজের এলাকায় না থেকে স্থাযীভাবে দিল্লিতে থেকে নিজের নিজের রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন।

এত তারকা নেতা দিল্লিবাসী হওয়া সত্ত্বেও দিল্লি কিন্তু অনেকদিন কংগ্রেসের হাতছাড়া। আটের দশকের শেষে আরিফ মহম্মদ খান যখন সদ্য কংগ্রেস ছেড়েছেন, নেতৃত্বের তখন মনে হল, গোপনে আরও কেউ কেউ ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। গুলাম নবি ওঁর বাংলোয় দু’জনকে পাঠালেন নজরদারি করার জন্য। অপেক্ষা করতে থাকলেন, কী খবর আসে। খবর এল শেষ পর্যন্ত। কী খবর, সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখে আরিফের লোকেরা ওই দু’জনকে বেজায় উত্তমমধ্যম দিয়ে বাড়িতে আটকে রেখেছে। গুলাম নবির ভয় হল, ওঁর নাম না বেরিয়ে পড়ে। আমাকে বলা হল, মিছিল নিয়ে তুঘলক রোড থানায় কিডন্যাপিংয়ের অভিযোগ জানিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে। মিছিলটা আরিফের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ওঁর লোকেদের সঙ্গে আমাদের মারামারি শুরু হয়ে গেল। সংখ্যায় বেশি ছিলাম বলে, সেই বাধা উতরে থানায় গিয়ে থানার ল্যান্ডফোন থেকে গুলাম নবিকে বিস্তারিতভাবে ঘটনা জানাতে উনি কাতর কণ্ঠে বললেন, মেরে ভাই, থানেসে ফোন করকে মুঝে কিউ মারওয়া রহে হো। জ্যায়সে ভি হো, তুম সামহাল লো, মুঝে ইস ঝগরেমে মত ডালো। থানায় অবস্থান করে ছেলে দুটিকে অবশ্য ছাড়ানো গিয়েছিল।

কদিন আগে রাজস্থান সংকট নিয়ে একটি নিবন্ধে আমি যা লিখেছিলাম, সম্প্রতি এক ইংরেজি দৈনিকে দেখলাম অনিল শাস্ত্রী একই কথা লিখেছেন। নিয়মিত জনসংযোগ স্থগিত হয়ে যাওয়ায় কর্মীদের হতাশা বাড়ছে। জি-২৩এর যাঁরা পুরোধা, দিল্লিবাসী হলেও এঁদের দেখা পাওয়া আরও কঠিন। গুলাম নবির বাংলোয় আবার দুটো গেট। সামনে ও পিছনে। দর্শনার্থীদের কেউ কেউ হয়তো মরিয়া হয়ে সকাল সাতটায় গিয়ে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন, বেরোলেই ধরবেন। নটা অবধি অপেক্ষা করে ধৈর্য্য রাখতে না পেরে অফিসে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানলেন, সাহেব বেরিয়ে গিয়েছেন! রাজীবজি একদিন সকালের জনসম্পর্ক শেষ হলে আমাকে বলেছিলেন, ডিপি, আমি গতকাল শাহরিয়ারের (মহম্মদ ইউনিসের ছেলে) সমাধিতে গিয়েছিলাম। কিছু লোক আমাকে কিছু বলতে চাইছিল, বৃষ্টির জন্য কাছে আসতে পারেনি। একটু জেনে এসো তো, ওঁরা কী বলতে চাইছিলেন। আমার সাহস হয়নি বলার যে, আমি এখন কী করে জানব তাঁরা কারা। নানাজনের সাহায্য নিয়ে জেনেছিলাম, ওঁরা আজিম ডায়ারির লোক। রাস্তার সংস্কার চাইছেন। দিল্লিবাসী এই নেতারা যদি দিল্লিটাও দেখতেন, তাহলে শীলা দীক্ষিতের হাতে গড়া রাজ্যটা কেজরিওয়ালের খাসতালুকে পরিণত হত না। দিল্লির রাজনৈতিক ভাগ্য যাঁরা নির্ধারণ করেন, তাঁদের মধ্যে ঝুগগিরঝোপরি, রিসেটলমেন্ট ও আনঅথরাইজড কলোনির বাসিন্দারাই সংখ্যায় বেশি।

নেতৃত্ব যতদিন সজ্জন কুমার ও তাঁর অনুগামী জয়কিষান, মুকেশ শর্মাদের হাতে ছিল, এই ভোটব্যাংক ততদিন কংগ্রেসের কাছে ছিল। দুর্ভাগ্য সজ্জন কুমারের। এখন তিনি জেলে বন্দি। যদিও আমি জানি, একদিন প্রমাণ হবে, ওঁকে অকারণে জেল খাটতে হয়েছে। এদিকে, মঙ্গলপুরী, সুলতানপুরী জোয়ালাপুরী সংগম বিহার ইত্যাদি জায়গাগুলো ওঁর অনুপস্থিতিতে কেজরিওয়ালের বিচরণভূমি হয়ে গিয়েছে। এই কলোনিবাসীদের মধ্যেই আছেন ভারত সরকার স্বীকৃত তিন লক্ষ হকার, যাঁরা ১৮ ঘণ্টা রোজগার করেন, তার মধ্যে ১২ ঘণ্টা পুলিশের জন্য, বাকি ছ’ঘণ্টা পরিবারের জন্য। এই হকারদের বৈধতা দিতে আইন এনেছিলেন অজয় মাকেন। তিনি তখন কেন্দ্রের মন্ত্রী। সে আইন দিল্লি পুলিশ এখন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে, হয়তো জি-২৩এর অনেকের তা জানাও নেই। এমনকি, ২০২০-র ফেব্রুয়ারিতে দিল্লির দাঙ্গায় ৫৭ জন প্রাণ হারানোর পরেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই তারকা নেতারা কেউ দাঙ্গাপীড়িতদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেননি। শেষ পর্যন্ত সোনিয়াজি বাধ্য হয়ে দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন। তার পরেও ওই নেতাদের কেউ গিয়েছিলেন বলে আমার জানা নেই।

কোনও রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু জি-২৩-কে সমর্থন করেননি। এজন্য নয় যে, এই চিঠির কোন সারবত্তা নেই। আসলে এঁদের সমর্থন না দিয়ে তাঁরা নিশ্চিত করলেন যে, অদূরভবিষ্যতে রাজ্যসভার মেয়াদ শেষ হলে এই গগনবিহারীরা যেন আবার তাঁদের ঘাড়ে চেপে বসতে না পারেন।

বিবেক তংখা (জি-২৩এর অন্যতম নেতা) আবার টিম আইনজীবীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। সাম্প্রতিককালে অনেকগুলি রাজনৈতিক মামলায় তাঁরা জয় ছিনিয়ে এনেছেন। আলাপ থাকলে জিজ্ঞাসা করতাম, এর সঙ্গে প্রশান্ত ভূষণকে কি অভিনন্দন জানানো যেত না? আজ তো জনমানসে উনিই যোদ্ধা, যিনি কার্যত বলতে চেয়েছেন, মরণ যখন অনিবার্য, হাসিয়াই চলিয়া যাই, রক্ষক যেথা ভক্ষক সেথা, মরা- সে তো বাঁচিয়াই।