রায়গঞ্জে দালালরাজ, চিকিৎসা পরিষেবা থেকে ব্রাত্য গরিবরা

- Advertisement -

রায়গঞ্জ : করণদিঘি থানার সাবধান গ্রামের বাসিন্দা সাবিনা বেগম। সাতমাসের অন্তঃসত্ত্বা। সরকারি হাসপাতালের আউটডোরে চিকিৎসককে দেখাবেন। কিন্তু সেখানে না নিয়ে গিয়ে এক রিকশাচালক ওই বধূকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন শহরের এক স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে। এই নিয়ে বাদবিতণ্ডা। রোগীর পরিজনদের সঙ্গে প্রায় হাতাহাতি।

রায়গঞ্জ থানার বাহিন গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা আসমা বেগম তিনমাসের শিশুকে রায়গঞ্জ মেডিকেলের আউটডোরে চিকিৎসককে দেখাতে এসেছিলেন। কিন্তু টোটোচালক তাঁকে মেডিকেলে না নিয়ে গিয়ে এক চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে নিয়ে যান। এমনটাই অভিযোগ রোগীর পরিজনদের। তাঁদের বক্তব্য, করোনার ভয় দেখিয়ে আমাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রাইভেট ডাক্তারের চেম্বারে। টোটোচালকের খপ্পরে পড়ে আমরাও সেখানে যেতে বাধ্য হচ্ছি।

রায়গঞ্জে প্রায় প্রতিদিনই এই ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে দূরদূরান্ত থেকে রোগী নিয়ে আসা মানুষজনের সঙ্গে। ফলে নিখরচায় ডাক্তার দেখাতে এসে প্রায় নিঃস্ব হতে হচ্ছে রোগীর পরিবারকে। নার্সিংহোম থেকে শুরু করে প্যাথলজি সেন্টার, সর্বত্রই দালালের ভূমিকায় শহরের একাংশ টোটো ও রিকশাচালক। রায়গঞ্জ মেডিকেল সংলগ্ন এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে চিকিৎসকদের চেম্বার। সেসব চিকিৎসকদের বিষয়ে জানা থাক আর না থাক, রোগী নিয়ে আসা মানুষজনকে ওই সমস্ত চেম্বারে নিয়ে যাওয়ার জন্য কার্যত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। খদ্দের ধরতে চিকিৎসকদের চেম্বার চালানোর দায়িত্বে থাকা লোকজনের একাংশ একসময় রিকশাচালকদের উপঢৌকন দিয়ে রোগী আনার কাজ চালাত। কিন্তু সময়ে সঙ্গে তারা কৌশল বদলেছে। এখন তারা এই কাজে যোগ করেছে টোটোচালকদের একাংশকে। আর এরাই শহরে আসা ট্রেন, বাস থেকে নামা অসুস্থ মানুষদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে সোজা নিয়ে যাচ্ছে ওই সমস্ত চিকিৎসকদের চেম্বারে। ফলে বহু গরিব মানুষ হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারছেন না।

গোটা ঘটনার পিছনে চিকিৎসকদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদেরও একটা চক্র মারাত্মকভাবে সক্রিয়। ফলে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা, পরিকাঠামো থাকলেও সেই পরিষেবা গ্রামগঞ্জ থেকে আসা গরিব মানুষ নিতে পারছেন না। তাঁদের ভুল বুঝিয়ে ভালো ডাক্তার দেখানোর কথা বলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রাইভেট চেম্বারগুলিতে। এমনকি তাঁদের বোঝানো হচ্ছে, হাসপাতালে বিনা পয়সায় ডাক্তাররা ভালো করে রোগী দেখেন না। ভালো চিকিৎসাও পাওয়া যায় না। ফলে অনেক সময় রোগীর পরিবার পরিজনরা ভালোমন্দ বুঝে উঠতে না পেরে এই দালালদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। ফলে একদিকে গরিব মানুষজনকে মোটা টাকার ভিজিট মেটাতে হচ্ছে, অন্যদিকে সেই চিকিৎসকদের যোগসাজশে থাকা কিছু প্যাথলজিক্যাল ল্যাব ও ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনতে এবং বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করাতেও বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে গরিব মানুষ সব দিক থেকেই শোষিত হচ্ছে।

এভাবেই প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চলছে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বরের দুধারে। এই ব্যবসার টাকা শুধু চিকিৎসক, প্যাথলজিক্যাল ল্যাব ও ওষুধ ব্যবসায়ীদের পকেটেই ঢুকছে না, এর একটা বড় অংশ যাচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের পকেটেও। কিন্তু কেন এই দালালরাজ? এর পিছনে কারা জড়িয়ে তাদের এত প্রভাব কোথা থেকে? অনেকেই বলছেন, এর শিকড় অনেক গভীরে। এখান থেকে মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা কাটমানি পৌঁছে যায় অনেক বড় প্রভাবশালীদের পকেটেও। সেটা কিন্তু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী মহলে কান পাতলেই শোনা যায়। তৃণমূল রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর রায়গঞ্জ জেলা হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে উন্নীত করা হয়। একসময় এইমস-এর দাবিতে তোলপাড় হয়েছিল এই জেলা।

শুধুমাত্র রাজ্য সরকারের বাধায় জেলাবাসীর সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রী মানুষের সেই প্রত্যাশাকে কিছুটা হলেও পূরণ করার উদ্যোগ নেন। তাঁর ঘোষণাতেই বছর দুয়েক আগে এখানে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন বিভাগীয় প্রধান থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এখানে পাঠানো হয়। কোটি কোটি টাকার সরঞ্জামও পাঠায় সরকার। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালের উন্নত যন্ত্রপাতিগুলিতে কোথাও ধুলো জমছে, আবার কোথাও এসবের ব্যবহারই হচ্ছে না। হাসপাতালের চিকিৎসকদের একাংশ তাঁদের দায়িত্ব ফাঁকি দিয়ে বহাল তবিয়তে প্রাইভেট প্র‌্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছেন।

এসব কারণেই মুখ্যমন্ত্রীর চালু করা উন্নত ও নিখরচায় চিকিৎসা পরিষেবা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাচ্ছেন না উত্তর দিনাজপুরবাসী। প্রশ্ন উঠেছে, প্রাইভেট চেম্বার করা চিকিৎসকরা যদি এতটাই ভালো হন, তাহলে কেন তাঁদের হাসপাতাল থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে চেম্বার করতে হয়েছে? কেন তাঁরা দূরে নিজেদের চেম্বার করেননি? ভালো চিকিৎসা হলে মানুষ নিজেরাই তাঁদের খুঁজে নেবেন। যদিও রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যক্ষ ও হাসপাতাল সুপার প্রিয়ঙ্কর রায় বলছেন, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে যা অভিযোগ উঠছে তা ঠিক নয়। এখানে রোগী ভর্তি হলেই তাঁদের চিকিৎসা করা হয়। শুধুমাত্র মুমূর্ষু রোগী থাকলেই তাঁদের অন্য মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রেফার করা হয়।

- Advertisement -