আলুবীজের দাম দ্বিগুণেরও বেশি, বিপাকে কৃষকরা

উত্তরবঙ্গ ব্যুরো : আলুবীজের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তরবঙ্গজুড়ে আলুচাষিরা সমস্যায় পড়েছেন। পাশাপাশি, সার ও কীটনাশকের দামও বেড়েছে। তাই এবারে আলু চাষ করে আদৌ কোনও লাভ পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে আলুচাষিরা ধন্দে রয়েছেন। সমস্যা মেটাতে অনেকে শীতকালীন সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন। দিনহাটা মহকুমা ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক রানা গোস্বামী বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারে আলুবীজের দাম অনেকটাই বেশি। কৃষকরা তাই শীতকালীন সবজি চাষে ঝুঁকছেন। ফালাকাটা ব্লকের সহ কৃষি অধিকর্তা অজিত রায় বলেন, আলুবীজ নিয়ে কালোবাজারি রুখতে আমরা সতর্ক রয়েছি। তবে আলু চাষের জমির এলাকা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। আলুবীজের দামের উপর নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে জলপাইগুড়ির উপ কৃষি অধিকর্তা (প্রশাসন) প্রবীর হাজরা জানান। উত্তর দিনাজপুরের উপ কৃষি অধিকর্তা (প্রশাসন) বিপ্লব দাস বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর আলু চাষের এলাকা অনেকটাই বেড়েছে। তবে আলুবীজের দাম অনেকটাই বেড়ে যাওয়ায় এই চাষে কৃষকদের আগ্রহ অনেকটাই কমেছে।

কৃষি দপ্তর সূত্রে খবর, দিনহাটায় দিনহাটা-১, দিনহাটা-২ ব্লকের পাশাপাশি সিতাই ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই সময় আলু চাষ হয়ে থাকে। পাশাপাশি একটি অংশে তামাক চাষও হয়ে থাকে। তবে আলু চাষের দিকে কৃষকদের ঝোঁক বেশি। এবছর আলুবীজের দাম অনেকটাই বেড়েছে। মূলত পঞ্জাব থেকে আসা ৫০ কেজির এই বীজের বস্তার দাম ৪,৮০০ টাকা। গত বছর এই দাম ২,২০০-২,৪০০ টাকা ছিল। কৃষকরা জানান, আলু চাষের জন্য এক বিঘা জমিতে প্রায় ১৫০ কেজি আলুবীজের প্রয়োজন হয়। তার ওপরে সার, কীটনাশক, জমির পরিচর্চার জন্য শ্রমিকের খরচ রয়েছে। সব মিলিয়ে এক বিঘা জমিতে আলু চাষে ২৫-৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। এসবের জেরে এবারে আলু চাষ করে আদৌ লাভ হবে কিনা তা নিয়ে কৃষকরা সংশয়ে রয়েছেন। তাই তাঁদের অনেকেই বাঁধাকপি, ফুলকপি, ধনেপাতা, বেগুনের মতো ফসলের চাষের দিকে ঝুঁকেছেন। সমস্যার জেরে ঝুড়িপাড়া গ্রামের আলুচাষি এনদাদুল হক, জিন্নাত আলি প্রমুখ সমস্যায় পড়েছেন। আটিয়াবাড়ির আলুচাষি যতীন বর্মন বলেন, আলু চাষের খরচ অনেকটাই বেশি হওয়ায় ফুলকপি, বাঁধাকপি ও ধনেপাতা চাষ করছি। আলুবীজের দাম বেশি থাকায় ফালাকাটায় এবারে আলু চাষের এলাকা বাড়ছে না। গত বছর ছয় হাজার হেক্টর এলাকায় আলুর চাষ হয়েছিল। এ বছরও একই পরিমাণ জমিতে আলুর চাষ হচ্ছে। পঞ্জাবের আলুবীজ এবারে এখানে কেজি প্রতি ৯০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভুটানের আলুবীজের দাম কেজি প্রতি কিছুটা কম। প্রায় ৬০-৭০ টাকা। ধূপগুড়ির আলু ব্যবসায়ী আশিস দাস বলেন, কিছু জাতের আলুবীজের প্যাকেটের দাম ৭০০-৮০০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমরা সমস্যায় পড়েছি।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গে ধূপগুড়ির পর ইসলামপুরেই সব থেকে বেশি আলু চাষ হয়। ইসলামপুরে প্রতি মরশুমেপ্রতি প্যাকেটে ৫০ কেজি ধরে অন্তত ১০ লক্ষ প্যাকেট আলুবীজের প্রয়োজন হয়। বেশিরভাগ বীজ পঞ্জাব থেকে আসে। এক সময় হিমাচল প্রদেশের আলুবীজ এরাজ্যে আসত। তার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সেখান থেকে আলুবীজ আনা বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া ভুটানের কাঁচা আলু সার্টিফায়েড না হওয়ায় কৃষকরা তার উপর ভরসা করতে পারছেন না। এবার চন্দ্রমুখী, পোখরাজ ও জ্যোতি আলুর বীজের দাম কোনও কোনওক্ষেত্রে দ্বিগুণ বা তারও বেশি। সারা ভারত কৃষকসভার উত্তর দিনাজপুরের জেলা সম্পাদক সুরজিৎ কর্মকার বলেন, করোনা পরিস্থিতির জেরে কৃষকদের অবস্থা কাহিল হয়েছে। তার উপর বেশি দামে আলুবীজ কিনতে গিয়ে কৃষকদের অবস্থা কাহিল হয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যদি সত্যিই কৃষকদরদি হত তাহলে তারা কৃষকদের ভরতুকিতে আলুবীজ সরবরাহ করত।

আলু চাষের নিরিখে গোটা দেশে প্রথম হলেও পশ্চিমবঙ্গে আলুবীজের উৎপাদনের পরিমাণ খুবই নগণ্য। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডঃ নারায়ণচন্দ্র সরকার বলেন, উন্নত আলুবীজ উৎপাদনের জন্য আর্দ্রতামুক্ত ঠান্ডা আবহাওয়ার প্রয়োজন হয়। এই আবহাওয়া ছাড়া সাধারণ আবহাওয়ায় আলুবীজ রাখলে তাতে ছত্রাক ধরার আশঙ্কা থাকে। তাই বহু চেষ্টা করেও আমাদের রাজ্যে উন্নতমানের আলুবীজ তৈরি করা যাচ্ছে না।