বাংলাদেশের সিম কার্ডই সীমান্তে পাচারের অস্ত্র

72

অরুণ ঝা, ইসলামপুর : সীমান্তে পাচারকারীদের হাতে সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র হয়ে উঠছে বাংলাদেশের বিভিন্ন মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডার সংস্থার সিম কার্ড। চোপড়া হোক বা ইসলামপুর, গোয়ালপোখর- মহকুমার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী গ্রামগুলি থেকে অবাধে বাংলাদেশের সিম কার্ড ব্যবহার করে ফোনে কথা বলা যায়। ভারতের সিম কার্ড না হওয়ায় তাতে কোনওভাবেই আড়ি পাততে পারছেন না এ দেশের পুলিশ ও গোয়েন্দারা। তাই গোরু পাচারই হোক বা অনুপ্রবেশ, সব ক্ষেত্রেই এই সিম কার্ড ব্যবহার করে লেনদেনের হিসাব করছে পাচারকারীরা। আর এটাই এখন বিএসএফ এবং প্রশাসনের কাছে মূল চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শীতকালকে পাচারকারীদের মরশুম বলা যায়। উত্তরবঙ্গে শীতকালের কুয়াশার আড়ালে পাচারকারীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে সীমান্ত এলাকা। সব জেনেও আতঙ্কে মুখ বন্ধ করে থাকেন সীমান্তবাসী। ইসলামপুর মহকুমায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার বাংলাদেশ সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে চোপড়ায় ৬৩.৪০ কিলোমিটার, ইসলামপুরে ৪২ কিলোমিটার, গোয়ালপোখরে ৩৫ কিলোমিটার এবং করণদিঘিতে প্রায় ৬০ কিলোমিটার বাংলাদেশ সীমান্ত রয়েছে। পুরো এলাকাতেই কাঁটাতারের বেড়া এবং ফ্লাডলাইটের ব্যবস্থা থাকলেও চোরাচালান কিন্তু বন্ধ হয়নি। গোরু হোক বা নিষিদ্ধ কাফ সিরাপ, সবকিছুই এই সীমান্ত দিয়ে নিখুঁত পরিকল্পনামাফিক পার করে পাচারকারীরা। কাঁটাতার কেটে পাচারের পর কাঁটাতার এমনভাবে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে যা সহজে বোঝার উপায় নেই।

- Advertisement -

এখনও জাঁকিয়ে শীত পড়েনি। তবে সীমান্ত এলাকায় ধীরে ধীরে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। শীতের পারদ যত বাড়তে থাকবে ততই ঘন হবে এই কুয়াশার চাদর। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সীমান্তে বাড়বে পাচারকারীদের সক্রিয়তা। ভারত থেকে একটি গোরু বাংলাদেশে পাচার করতে পারলেই তার বাজারমূল্য দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হয়ে যায়। একইভাবে কাফ সিরাপের দামও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

এখানেই শেষ নয়, এপার থেকে গোরু, কাফ সিরাপ পাঠিয়ে ওপার থেকে মানুষও এপারে নিয়ে আসা হয়। এই চক্রও দীর্ঘদিন ধরেই এই মহকুমার সীমান্তে সক্রিয় রয়েছে। আর এই পুরো কারবারই হয় মোবাইল কথোপকথনের মাধ্যমে। এপারে সীমান্তের প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত বাংলাদেশ গ্রামীণ ফোন সহ সেদেশের একাধিক মোবাইল নেটওয়ার্ক ভালোভাবে কাজ করে। একইভাবে ওপারের পঞ্চগড়, বালিয়াডাঙ্গি, হরিপুর থানা এলাকায় ভারতীয় বিভিন্ন বেসরকারি মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডার সংস্থার নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। তবে সূত্রের খবর অনুযায়ী, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুদেশের পাচারকারীরাই বাংলাদেশের সিম কার্ড ব্যবহার করে কথাবার্তা চালায়।

চোপড়া, ইসলামপুর, গোয়ালপোখরের একাধিক সীমান্তবর্তী গ্রামে ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বোঝা গেল, তাঁরা ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটান। একদিকে বিএসএফের চোখরাঙানি, অন্যদিকে পুলিশ এবং পাচারকারীদের সিন্ডিকেটের দাপটে তাঁদের নাজেহাল অবস্থা। একজন তো বলেই ফেললেন, আমাদের অবস্থা এখন জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। আমরা কোনও জায়গাতেই কথা বলতে পারি না। গ্রামবাসীদের বক্তব্য, শীত এলেই চোরাকারবার অন্য মাত্রা নেয়। মহকুমার বাংলাদেশ সীমান্ত বর্তমানে তারকাঁটার বেড়া দিয়ে নিরাপত্তার চাদরে মোড়া রয়েছে। ফলে আগের মতো ঢালাও গোরু, মাদক বা মানব পাচার পাচারচক্রগুলি করে উঠতে পারে না। কিন্তু সীমান্ত এলাকা ঘুরে জানা গিয়েছে, মাঝেমধ্যেই তারকাঁটার বেড়া কাটা যায়। আর ওই ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশে পাচার হয়ে যায় গোরু, মাদক। কাজের সন্ধানে এপারে আসেন ওপার বাংলার মানুষও।