মালদা মেডিকেলে ডাক্তারি পড়বেন দিনমজুরের ছেলে

রণবীর দেব অধিকারী, ইটাহার : ঘরে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। নিরক্ষর বাবা কখনও দিনমজুর, কখনও ভ্যানরিকশা চালক। এমন দরিদ্র পরিবারে জন্মে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন! সে তো আকাশ কুসুম! তবু স্বপ্ন দেখতেন আনন্দ। জেগে জেগেই স্বপ্নের জাল বুনতেন টিনের একচালা ঘরে। অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণের হাতছানি এল। দিনমজুরের ছেলে আনন্দ বর্মন এবার ডাক্তারি পড়বেন মালদা মেডিকেল কলেজে। ইতিমধ্যেই গত বুধবার মালদা মেডিকেল কলেজে গিয়ে ভর্তি হয়েছেন তিনি।

পথটা যে সহজ ছিল না, তা আনন্দর বাড়ির চেহারা দেখলে কিংবা তাঁর পারিবারিক প্রেক্ষাপটের গল্প শুনলেই অনুভব করা যায়। আনন্দর বাড়ি ইটাহার ব্লকের হাসুয়া গ্রামে। মা-বাবা ও এক ভাই, এক বোন মিলিয়ে চার জনের সংসার। বাবা প্রেমকুমার বর্মন একসময় রায়গঞ্জ শহরে গিয়ে রিকশা চালাতেন। পরে নিজে একটি ভুটভুটি ভ্যান কিনে গ্রামেই যাত্রী ও মাল বহন করতেন। কিন্তু সেই পেশাতেও নানা সমস্যা দেখা দেওয়ায় সব ছেড়ে দিনমজুরির কাজ শুরু করেন। আনন্দর মা হিরণ বর্মন নিতান্তই গৃহবধূ। অনটনের এই সংসারেই বড় হয়ে উঠছিলেন আনন্দ। পেটের ক্ষুধা মিটত স্কুলের মিড-ডে মিল খেয়ে এত টানাপোড়েনেও পড়াশোনার প্রতি কখনই অমনোযোগী হননি তিনি। ভূপালচন্দ্র বিদ্যাপীঠ থেকে মাধ্যমিকে ভালো ফল করার পর ইচ্ছা প্রকাশ করে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার।

- Advertisement -

কিন্তু তাতে যে অনেক খরচ! সেই অসহায়তার কথা বলতেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন ভূপালচন্দ্র বিদ্যাপীঠের শিক্ষকরা। ওই স্কুলেই ভর্তি হন বিজ্ঞান বিভাগে। দুই বছর পর ২০১৯ সালে ফের সাফল্য। ৯৪.২ শতাংশ নম্বর নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন আনন্দ। এরপর রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকস্তরের প্রথম বর্ষে ভর্তি হন তিনি। এই সন্ধিক্ষণেই বরাবরের মতো তাঁর পথ প্রদর্শক হিসাবে পাশে এসে দাঁড়ন স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী ও কোয়াক ডাক্তার আক্তার হোসেন। আক্তারবাবু বলেন, আনন্দ বিজ্ঞান বিভাগে কলেজে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। আমিই তাকে পরামর্শ দিয়ে বলি, তোর তো ডাক্তারি পড়ার যোগ্যতা আছে। তুই নিট পরীক্ষায় বস। যা সহযোগিতা করার আমি করব।

এরপর আক্তার হোসেনের সৌজন্যেই কলকাতার একটি বেসরকারি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে নিটের কোচিং নেওয়া শুরু করেন আনন্দ। আনন্দর অধ্যাবসায় ও পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ওই সংস্থাও। সংস্থার হস্টেলে থেকে নিখরচায় খাওয়া ও পড়াশোনার ব্যবস্থা হয়ে যায়। কাউকে অবশ্য নিরাশ করেননি আনন্দও। ২০২০ সালের নিট পরীক্ষায় রাজ্যের মধ্যে ৪৮৯ র‌্যাংক করেন তিনি। রেজাল্ট হাতে পেতেই খুশির জোয়ার আনন্দর পরিবার ও তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী মহলে। সোমবার আক্তার হোসেন সহ ভূপালচন্দ্র বিদ্যাপীঠের শিক্ষকরা আনন্দর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে অভিনন্দন ও সংবর্ধনা জানান। পাশাপাশি তাঁর এই অগ্রগতির পথে সবসময় সবরকমভাবে পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

তাঁদের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন আনন্দ ও তাঁর বাবা প্রেমকুমারও। আনন্দ বলেন, আমি এতদূর আসতেই পারতাম না, যদি আমার দিকে স্কুলের শিক্ষকরা ও আমার ধর্মদাদু আক্তার হোসেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে না দিতেন। আমার ভালোভাবে পড়াশোনার যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়েছেন আমার ওই দাদু ও স্কুলের স্যাররা। আমাকে নিয়ে তাঁদের যে স্বপ্ন, আমি তা অবশ্যই পূরণ করেই ছাড়ব। প্রেমকুমার বর্মন বলেন, জন্মের পর থেকেই ছেলের অসুখবিসুখে চিকিৎসা করাতে যেতাম আক্তারকাকুর কাছে। তখন থেকেই ছেলের ভালোমন্দ সব কিছুই তিনি দেখতেন। বড় হওয়ার পর থেকে ছেলের পড়াশোনা চালানোর ব্যাপারেও আক্তারকাকু এখনও সাহায্য করে চলেছেন। আমি তো দিনমজুরি করে কোনওরকমে পেটের ভাত জোগাড় করি। ছেলেকে অতদূর পড়ানোর মতো ক্ষমতা আমার নেই। ওর স্কুলের মাস্টারমশাইরা ও আক্তারকাকু ছিলেন বলেই ছেলেকে নিয়ে আমিও এখন স্বপ্ন দেখছি।