ঘাসফুল শিবিরের কর্মীসভা হল গেরুয়া মাটি হবিবপুরে

0
271
- Advertisement -

হবিবপুর: বাংলা ও বাঙালির বড়ো উৎসব দুর্গাপুজো করোনা আবহে এবার অনেকটাই ম্যাড়ম্যাড়ে। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তাপ কম নেই শারদোৎসবের মধ্যেও। এই আবহেই তৃণমূল শুক্রবার হবিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রিক বুথ ভিত্তিক কর্মী সভা করল কেন্দপুকুরে। উপস্থিত ছিলেন জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন, কো- অর্ডিনেটর দুলাল সরকার (বাবলা), হবিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের দলীয় কো-অর্ডিনেটর অমল কিস্কু, জেলা যুব তৃণমূল সভাপতি প্রসেনজিৎ দাস। এছাড়াও ছিলেন বামনগোলা ব্লক তৃণমূল সভাপতি অশোক সরকার, হবিবপুর ব্লক তৃণমূল সভাপতি উজ্জ্বল মিশ্র প্রমুখ। প্রধান অতিথি হিসেবে জেলা সভানেত্রীর নাম সকাল থেকে ঘোষণা হতে থাকলেও উপস্থিত থাকতে পারেনি মৌসম নূর। বেলা ১১ টায় সম্মেলন শুরুর কথা থাকলেও অবশেষে বেলা ১ টা নাগাদ প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্যে দিয়ে সম্মেলনের সূচনা করেন উপস্থিত নেতৃবৃন্দ। দোল অনেক দেরি থাকলেও রাজনৈতিক রঙ নিয়ে চর্চা হয়েছে সম্মেলনে। বাম কংগ্রেসকে বেঁধার পাশাপাশি বক্তব্যে আক্রমনের লক্ষ ছিল বিজেপিও। সম্মেলনে বিভিন্ন বক্তারা নেতা কর্মীদের মিলেমিশে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন। মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন,হবিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ভালো জায়গায় আছে দল। নিজেদের মধ্যে কিছু সমস্যার কারণে বিরোধীরা সুযোগ নিচ্ছে।

যদিও হবিবপুর বিধানসভা নিয়ে আক্ষেপের সুর ফুটে ওঠে দুলাল সরকারের গলায়। তিনি বলেন, আমরা হয়তো সব মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারিনি। হয়তো কিছু ভুল ত্রুটি ছিল। সব কিছু থেকে বেরিয়ে এসে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের উন্নয়নের বার্তা পৌছে দিতে হবে মানুষের মধ্যে। সমালোচকদের কথায় এদিনের সম্মেলনে বিরোধীরা টার্গেট হলেও সকলকে একসঙ্গে চলার বার্তা দিয়ে আভ্যন্তরীণ কোন্দলের প্রসঙ্গও ধরা পড়েছে বিভিন্ন নেতৃত্বদের বক্তব্যে। পুজোর মধ্যেও জনসংযোগ রাখার বার্তা দেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতই পুজোর বাদ্যি বেজে উঠেছে৷ পুজো শুরুর এক সপ্তাহেরও আগে সেই বাদ্য বাজিয়ে দিয়েছেন খোদ রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান৷ দু’দিন ধরে রাজ্যের কয়েকশো পুজোমণ্ডপের উদ্বোধন করে দিয়েছেন তিনি৷ করোনা আবহে অবশ্যই নবান্ন থেকে ভার্চুয়ালি৷ কিন্তু উৎসবের বাদ্যি বাজালেও তাঁর কানে এখন শুধুই ভোটের বাজনা৷ তিনিই যে নেত্রী! তার ওপর দলের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে একসময় এ’রাজ্যে কার্যত ব্রাত্য হয়ে থাকা গেরুয়া শিবির৷ তাই যে কোনও উপায়ে পদ্ম থেকে এখন বাঙালিকে আলাদা রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ঘাসফুল শিবিরের মূল স্তম্ভ৷ একই ভাবনায় তাঁর দলের থিংক ট্যাংকও৷ সমালোচকদের কথায়, সম্ভবত নেত্রীর মাথায় ছিল না, দুর্গাপুজোয় প্রচুর পদ্মের প্রয়োজন৷ শুধুমাত্র সন্ধিপুজোতেই ১০৮৷ এই অংক আগে মাথায় ঢুকলে পাহাড় থেকে সাগর পর্যন্ত মানুষ এক সপ্তাহ আগে থেকেই দুর্গতিনাশিনীর আবাহনে মেতে উঠতে পারত কিনা সন্দেহ৷

এগারো আর একুশের মধ্যে ফারাক দশের৷ ওই সময় বামেদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যেভাবে রাজ্যে দলের ক্ষমতায়ন হয়েছিল, এই সময় সেই টোটকা যে চলবে না তা বিলক্ষণ জানেন তৃণমূলনেত্রী৷ ওয়াকিবহাল মহলের মতে,দশ বছর আগে তাঁর দল ভোটারদের কাছ থেকে যে প্রতিষ্ঠানবিরোধী সমর্থন পেয়েছিল, এবার সেটা ব্যুমেরাং হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল৷ কারণ, এই সময়ের মধ্যে তাঁর দলের আধুলি-সিকিদেরও দেমাক বেড়েছে৷ এক দশক আগে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ানো ছেলেছোকরার দল এখন হাতে-গলায় কয়েক ভরি ঝুলিয়ে দশলাখিতে চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ খাতায়কলমে গরিব মানুষ অনেক কিছু পাচ্ছে৷ কিন্তু তাদের অভাব মিটছে কই? মালদা জেলায় তো সেই ছবি ধরা পড়ে না৷ বিশ্ব কাঁপিয়ে দেশে যখন করোনা ঢুকেছে, তখনও ঘরছাড়া ছিল এখানকার লাখ দুয়েক মানুষ৷ কেন? এখানে নাকি কাজ নেই, মজুরি নেই, সরকারি সহায়তা নেই৷ আছে শুধু কাটমানি৷ ১০০ দিনের কাজ, মাথার ওপর সরকারি ছাদ, গতিধারা, এমনকি সমব্যথীর সুবিধা পেতেও নাকি দিতে হচ্ছে কাটমানি৷ অভিযোগ শুধু মুখ দিয়েই বেরোয়নি, বেরিয়েছে কলম দিয়েও৷ অবাক কাণ্ড! মানুষের অভিযোগ যে বাস্তব, তা মেনে নিয়েছেন শাসকদলের সর্বময়কর্ত্রী৷ প্রকাশ্যেই নির্দেশ দিয়েছেন, কাটমানি ফেরাতে হবে সবাইকে৷ হাতে গোনা কয়েকজন তাঁর নির্দেশ পালন করলেও গোটা রাজ্যে তা কতটা কাজে এসেছে জানা নেই৷ তাই পেট চালাতে করোনাকে পাশবালিশ করেই এই জেলার মানুষ ফের ভিনরাজ্যে কাজে যেতে শুরু করে দিয়েছেন৷

কাটমানি যে একুশে ঘাসফুলের ভোটও কাটতে পারে, তা বিলক্ষণ বুঝেছিলেন ‘ভিনদেশি’ প্রশান্ত কিশোর৷ এরাজ্যে শাসকদলের ভোটকুশলি৷ দায়িত্ব পেয়ে দলবল নিয়ে বছর দেড়েক আগেই ময়দানে নেমে পড়েছিলেন তিনি৷ কিন্তু যত সময় যাচ্ছে, ততই তাঁর চোখ কপালে উঠছে৷ শুধুই কি কাটমানি? নেতায় নেতায় লড়াইয়ে কীভাবে প্রাণ ওষ্ঠাগত মানুষের, তাঁর নজরে এসেছে৷ প্রত্যন্ত এলাকায় দলের অজানা নেতারাও কীভাবে মানুষকে ধমকাচ্ছে, চমকাচ্ছে, তাঁর নজরে এসেছে৷ কীভাবে মানুষের সঙ্গে দলের ফাটল প্রতিদিন চওড়া হচ্ছে, তাও তাঁর নজরে এসেছে৷ তিনি নিজের কাজ করেছেন৷ পুরো বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছেন ঘাসফুলের শীর্ষ নেতৃত্বকে৷ তাই দু’দিন আগেই তড়িঘড়ি উত্তরবঙ্গের রাজধানীতে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে উড়ে গিয়েছিলেন দলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়৷ উত্তর দিনাজপুর ছাড়া উত্তরের বাকি জেলাগুলির নেতৃত্বকে সেখানে তলব করা হয়েছিল৷ রূদ্ধদ্বার কক্ষে পইপই করে সবাইকে বোঝানো হয়েছিল, কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে৷ বৈঠকে যে অনেক তেতো কথা চালাচালিও হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য৷ কারণ, ওই বৈঠকে জেলা তৃণমূল সভানেত্রী মৌসম নুর, বাবলা সরকারের সঙ্গে ছিলেন কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরিও৷ তিনি যে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়বেন না, তা এই জেলার অনেকেই বিলক্ষণ জানে৷

সবই হয়েছে, কিন্তু এখনও এই জেলায় শাসকদলকে ঐক্যবদ্ধ করা যায়নি৷ শুধু আমআদমির কথা নয়, এটা ঘাসফুল শিবিরের অন্দরেরও কথা৷ পিকে দর্শনে জেলার বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে দলের যে কর্মী সম্মেলন শুরু হয়েছে, তাতে বারবার উঠে এসেছে অনৈক্যের ছবি৷ ইংরেজবাজারের জহুরাতলা থেকে কেন্দপুকুর। প্রকাশ্য হোক বা আভ্যন্তরীণ। প্রায় জায়গাতেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ছবিটা বড্ড দৃষ্টিকটু৷ তাই দলের জেলা সভানেত্রী, চেয়ারম্যান সহ শীর্ষ নেতৃত্বকে বারবার বলতে হচ্ছে, আপনারা ঐক্যবদ্ধ হন৷ সবাই একসঙ্গে ভোটের লড়াইয়ে নেমে পড়ুন৷ সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নে কোথাও কোথাও তাঁরা স্বীকার করতেও বাধ্য হচ্ছেন, সমস্যা আছে৷ মেটানোর চেষ্টা চলছে৷ আজও কেন্দপুকুরে সেই বার্তাই মিলেছে নেতৃত্বদের গলায়৷ তখন মঞ্চে বসে দলের হবিবপুর ব্লকের প্রাক্তন ও বর্তমান সভাপতি প্রভাস চৌধুরি ও উজ্জ্বল মিশ্র৷ বামনগোলা ব্লকের প্রাক্তন সভাপতি ও বর্তমান সভাপতি, অমল কিসকু এবং অশোক সরকারও৷ গত বিধানসভা ভোটে এই আসনের দলীয় প্রার্থী অমল কিসকুকে অবশ্য ব্লক কো-অর্ডিনেটর পদে বহাল করে কার্যত পুনর্বাসন দিয়েছে তৃণমূল নেতৃত্ব৷ এতে বামনগোলা ব্লকে দ্বন্দ্বের বারুদে কিছুটা জল ঢালা গেলেও হবিবপুর নিয়ে চিন্তায় মৌসম-মোয়াজ্জেমরা৷

গত বিধানসভা উপনির্বাচনে হবিবপুর জানান দিয়েছে, লালমাটির দখল নিয়েছে গেরুয়া শিবির৷ সমস্ত শক্তি প্রয়োগেও বিফল হয়েছে শাসক শিবির৷ শেষবার মালদায় এসে তৃণমূলনেত্রী প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ‘স্নেহভাজন’ কৃষ্ণেন্দুকে৷ এই গড়ের দায়িত্ব নিতে হবে তাঁকে৷ নেত্রীর আদেশ শিরোধার্য করে বেশ কয়েকবার এলাকায় আসেন কৃষ্ণেন্দুবাবু৷ কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, তাঁর উপস্থিতি কমতে কমতে এখন ডুমুর গাছে আশ্রয় নিয়েছে৷ আজ দলীয় কর্মী সম্মেলনেও তাঁকে দেখা যায়নি৷ তবে সম্মেলনে মোয়াজ্জেম সহ ছিলেন দুলাল সরকার(বাবলা), অশোক সরকার, উজ্জ্বল মিশ্র, অমল কিসকু এবং দুই ব্লকের ২৭২টি বুথের কর্মী ও সমর্থকরা৷ এর আগে অন্য কেন্দ্রগুলিতে নেতৃত্ব মাইক হাতে যে কথা বলেছে, আজও তার অন্যথা হয়নি৷

একসময় দলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড এখন প্রতিপক্ষের একই পদে৷ রাজ্যের অন্য এলাকার সঙ্গে মালদা জেলার রাজনীতিটাও হাতের তালুর মতো চেনেন মুকুল রায়৷ অনেক আগেই তিনি এই জেলার বেশ কিছু তৃণমূল নেতাকে টার্গেট করেছেন৷ বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, ওই নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও রয়েছে তাঁর৷ তালিকায় নাম শোনা যাচ্ছে অনেকের৷ সম্প্রতি গাজোলের সুশীল রায়কে দলে টেনে তিনি নিজের বার্তা জেলার রাজনৈতিক মহলে ছড়িয়ে দিয়েছেন৷ এতেই কি কাঁপুনি ধরেছে শাসক শিবিরে? যতদূর খবর, পুজো শেষে জেলায় আসতে পারেন অভিষেক-প্রশান্ত৷ কেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ ততদিনে দলের বিধানসভাভিত্তিক কর্মী সম্মেলনও শেষ হয়ে যাবে৷ তখন ওই দু’জনের কাছে কী বার্তা দেবে জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব? সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন৷

- Advertisement -